দক্ষিণ সুরমায় মাতৃরূপে দেবীর আরাধনা, কুমারী সানন্দাকে ঘিরে ভক্তদের ঢল

এফএনএস (এইচ এম শহীদুল ইসলাম; সিলেট) : | প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:০৬ পিএম
দক্ষিণ সুরমায় মাতৃরূপে দেবীর আরাধনা, কুমারী সানন্দাকে ঘিরে ভক্তদের ঢল

সিলেটের দক্ষিণ সুরমার জৈনপুরে মহাঅষ্টমীর পুণ্যক্ষণে এক শিশুর মাঝে মাতৃরূপের আরাধনায় মেতে উঠলেন হাজারো ভক্ত। উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি আর বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণে মুখরিত হয়ে উঠল শ্রীশ্রী মহালক্ষ্ণী ভৈরবী গ্রীবা মহাপীঠস্থান সংলগ্ন দুর্গামন্দির। সাত বছর বয়সী কুমারী সানন্দা চক্রবর্তীকে দেবীরূপে আসনে বসিয়ে আয়োজিত এই পূজা পরিণত হয় ভক্তি, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক আবেগের এক অনন্য মিলনমেলায়। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টায় সিলেট সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের জৈনপুরে অবস্থিত ৫১ পীঠের অন্যতম সতীপীঠ হিসেবে পরিচিত এই পীঠস্থান প্রাঙ্গণে কুমারী পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পীঠস্থান পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত পূজাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই ভক্তদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসেন অসংখ্য পুণ্যার্থী। শিববাড়ি, জৈনপুর, চান্দাইসহ আশপাশের এলাকায় ভক্তদের উপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। তাঁদের প্রত্যাশা, কুমারী মাতার দর্শন, প্রার্থনা আর দেবীর আশীর্বাদ লাভ।

শিশুর মাঝে দেবীর প্রতিচ্ছবি:  পূজার আগে নানা বস্ত্র, প্রসাধনী ও অলংকারে সাজানো হয় কুমারী সানন্দাকে। কপালে আঁকা হয় রক্তবর্ণের ত্রিনয়ন, মাথায় শোভা পায় শ্বেতশুভ্র ফুলের মালা, আর গলায় পরানো হয় লাল জবার মালা। সাজসজ্জার পর দেবীরূপী কুমারীকে আসনে বসানো হলে ভক্তদের মাঝে তৈরি হয় গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগঘন মুহূর্ত। পুরোহিত হরিনারায়ণ চক্রবর্তী বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। চারদিকে ধ্বনিত উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনির সঙ্গে ভক্তদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় দেবী দুর্গার জয়ধ্বনি। আধ্যাত্মিক আবহে মন্দির প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী পূজায় দেবীরূপী অন্নপূর্ণার মাতৃরূপ আরাধনা করেন ভক্তরা। পূজা শেষে ভক্তি ও তৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফেরেন উপস্থিত পুণ্যার্থীরা।

অতিথিদের উপস্থিতিতে উৎসবের মাত্রা বাড়ে: কুমারী পূজা চলাকালে মণ্ডপ পরিদর্শন ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন সিলেটে নিযুক্ত ভারতের সহকারী হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাস ও তাঁর সহধর্মিণী, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী এবং সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্যের সহধর্মিণী দিলারা মালিক। এ ছাড়া বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, বাংলাদেশ পূজা ফ্রন্ট, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ এবং জৈনপুর, শিবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

শান্তিপূর্ণ আয়োজন, আয়োজকদের কৃতজ্ঞতা: অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহাপীঠ পরিচালনা কমিটির সভাপতি শিবব্রত ভৌমিক চন্দন। সাধারণ সম্পাদক জনার্দন চক্রবর্তী মিন্টুর পরিচালনায় পূজার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় কমিটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ দায়িত্ব পালন করেন। পূজা নির্বিঘ্নে ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় আয়োজক কমিটির সভাপতি শিবব্রত ভৌমিক চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক জনার্দন চক্রবর্তী মিন্টু সংশ্লিষ্ট সবাই, স্বেচ্ছাসেবক এবং উপস্থিত ভক্তদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে জৈনপুরের এই কুমারী পূজা হয়ে ওঠে মানুষের মিলন, সম্প্রীতি ও বিশ্বাসের এক তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজন। মহাঅষ্টমীর দিনে শিশুর মাঝে দেবীমাতার প্রতিচ্ছবি দর্শনের মধ্য দিয়ে ভক্তরা যেন নতুন করে অনুভব করেন মাতৃশক্তির প্রতি তাঁদের চিরন্তন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে