ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ও সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়ার মধ্যে বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তা না পাওয়া, ফোন না ধরা এবং এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নেতা-কর্মীদের নিয়ে থানায় যান রুমিন ফারহানা। রাত ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ওসির কক্ষে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত কথোপকথন হয়। একপর্যায়ে ওসিকে ‘আওয়ামী লীগের চোর’ বলে মন্তব্য করেন সংসদ সদস্য। ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
রুমিন ফারহানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য, যার আওতাভুক্ত সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ। তাঁর কর্মী-সমর্থকদের দাবি, কয়েক দিন ধরে সংসদ সদস্যের সঙ্গে ওসির দূরত্ব তৈরি হয়েছে। রুমিন ফারহানা ও তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) জাকির হোসেন একাধিকবার ফোন করলেও ওসি সাড়া দেননি। এমনকি ফোনও ধরেননি। এ ছাড়া নিরাপত্তা চেয়েও পাননি বলে অভিযোগ করেন সংসদ সদস্য।
কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সরাইল থানায় গিয়ে ওসির কক্ষে বসেন রুমিন ফারহানা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তিনটি ভিডিওর একটি ৭ মিনিট ৮ সেকেন্ড, দ্বিতীয়টি ৫৭ সেকেন্ড এবং তৃতীয়টি ২ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের। ভিডিওতে দেখা যায়, ওসি মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া তাঁর কক্ষে বসে আছেন। পাশে বসেছেন রুমিন ফারহানা। টেবিলের চারপাশে সংসদ সদস্যের নেতা-কর্মীদের অবস্থান করতে দেখা যায়।
ভিডিওতে সংসদ সদস্য, তাঁর পিএস ও নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন বিষয়ে ওসিকে প্রশ্ন করতে শোনা যায়। বারবার ফোন করেও সাড়া না পাওয়া এবং নিরাপত্তা না দেওয়ার বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে তর্ক হয়। একপর্যায়ে রুমিন ফারহানা ওসির বিরুদ্ধে ইটভাটা, মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ তোলেন। পরে ওসি পুলিশ সুপারকে ফোন করে ঘটনার কথা জানান। এ সময় তিনি মব সৃষ্টির অভিযোগ করেন এবং ভিডিও কলে কক্ষে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের পুলিশ সুপারকে দেখান। রুমিন ফারহানা পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও ওসি সাড়া দেননি বলে সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, আইন অনুযায়ী স্থানীয় সংসদ সদস্য নিরাপত্তা চাইলে পুলিশ তা দেওয়ার ব্যবস্থা করে। আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরে পুলিশ তাঁকে নিরাপত্তা দিলেও সরাইলে একই ধরনের সহযোগিতা পাননি। তাঁর অভিযোগ, দুর্গাপূজার সময় সরাইল থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
রুমিন ফারহানা বলেন, তাঁর পিএস ১২ বার ফোন করলেও ওসি ফোন ধরেননি। ওসি তাঁকে নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে বলে জানিয়েছেন। এ কারণে তিনি নিজেই নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন বলে দাবি করেন।
সংসদ সদস্য বলেন, “এখন থেকে ১০ হাজার লোকজন নিয়েই চলব।”
ওসির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পর্কে রুমিন ফারহানা বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে কথা বলতে তিনি থানায় গিয়েছিলেন এবং অভিযোগের একটি তালিকাও সঙ্গে নিয়েছিলেন। দুই পাতার ওই তালিকায় বিভিন্ন তারিখে সংঘটিত অপরাধের বিবরণ ছিল বলে দাবি করেন তিনি। তবে ওসি অভিযোগগুলোর বিষয়ে সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি বলে জানান সংসদ সদস্য।
থানায় যাওয়াকে মব সৃষ্টির অভিযোগ হিসেবে দেখারও বিরোধিতা করেন রুমিন ফারহানা। তাঁর প্রশ্ন, তিনি কাউকে থানা থেকে ছিনিয়ে আনেননি, ওসির কাছে টাকা চাননি কিংবা কোনো সুবিধা দাবি করেননি। তাহলে মব সৃষ্টির অভিযোগ কেন তোলা হচ্ছে?
ওসিকে উদ্দেশ করে কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি বলেন, “আপনি (ওসি) যখন বলতেছেন, ওনার নিরাপত্তা ওনার লোকজন দিবেন। তার মানে আমি দিব না।”
জবাবে ওসি বলেন, “এটাই তো স্বাভাবিক। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেভাবে রাস্তাঘাটে হাঁটি বেড়ায়...”। তখন রুমিন ফারহানা ওসির আগের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “আপনি তো বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন। জি স্যার, আপনার হিস্ট্রি তো আমি জানি।”
অন্যদিকে, সরাইল থানার ওসি মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, সংসদ সদস্য বিপুলসংখ্যক লোকজন নিয়ে থানায় এসে হইচই করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করেছেন। এতে তিনি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন বলে জানান।
ওসি বলেন, সংসদ সদস্য তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তুলেছেন, সেগুলো মিথ্যা। তাঁর দাবি, রুমিন ফারহানা আওয়ামী লীগের লোকজনকে গ্রেপ্তার না করার জন্য তাঁকে নিয়মিত চাপ দেন। বিষয়টি তিনি নোট করে রেখেছেন বলেও জানান।
নিরাপত্তার বিষয়ে ওসি বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে এলাকায় সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য সংসদ সদস্যের সঙ্গে সার্বক্ষণিক পুলিশ সদস্য রাখা সম্ভব হয়নি। থানায় জনবলসংকট রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে পরিমাণ পুলিশ সদস্য আছেন, তা দিয়ে থানার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেই হিমশিম খেতে হয়।
ওসির ভাষ্য, সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য গানম্যান চাইলে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আবেদন করতে হবে। পুরো ঘটনাটি ভিডিও করা হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে।
এদিকে, ওসির বিরুদ্ধে ইটভাটা থেকে টাকা নেওয়া, মাটি কাটা ও বালু উত্তোলনসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির যে অভিযোগ রুমিন ফারহানা তুলেছেন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়নি।