সাতক্ষীরায় বেড়িবাঁধের ৪১ কিলোমিটারে ঝুঁকি, ভাঙনের হুমকিতে বসতবাড়ি ও বাজার

এফএনএস (এস.এম. শহিদুল ইসলাম; সাতক্ষীরা) : | প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:১৫ পিএম
সাতক্ষীরায় বেড়িবাঁধের ৪১ কিলোমিটারে ঝুঁকি, ভাঙনের হুমকিতে বসতবাড়ি ও বাজার

​সাতক্ষীরায় কোথাও নদীবাঁধে দেখা দিয়েছে মারাত্মক ফাটল, আবার কোথাও ধসে পড়েছে বাঁধের বড় অংশ। ফলে উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় বসতবাড়ি, বাজার ও কৃষিজমি মারাত্মক ভাঙন ও প্লাবনের ঝুঁকিতে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ৬৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ৪১ দশমিক ১৮ কিলোমিটার বাঁধ চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।

​সরেজমিনে আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বেতনা নদের তীব্র স্রোতে পাড় ধসে পড়ছে। বাজারের একাধিক দোকানপাট ও আশপাশের বাড়িঘর এখন বিলীন হওয়ার পথে। সম্প্রতি সেখানকার একটি বেকারির ঘর নদীতে ধসে গেছে। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা শাহামত আলী সরদার জানান, ছোটবেলায় দেখা নদের সীমানা ভাঙতে ভাঙতে এখন বসতবাড়ির দ্বারে এসে পৌঁছেছে। তাঁর সব কৃষিজমি আগেই নদে তলিয়ে গেছে।

​শুধু বুধহাটা নয়, আশাশুনির সদরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মরিচ্চাপ নদীর তীরের দৃশ্যও একই রকম। সেখানকার বাসিন্দা মিনারা বেগম জানান, প্রায় ১০ বছর আগে তৈরি করা তাঁদের বসতবাড়ির সামনের জমি নদীর পেটে চলে গেছে। গত এক বছরেই বাড়ির তিনটি ঘর নদে বিলীন হয়েছে, বাকি অংশও এখন ধসের মুখে। আশাশুনি বাজারের চায়ের দোকানদার মোহাম্মদ আবদুল হাই জানান, নদী খননের সময় চর কেটে স্রোতের গতিপথ বদলানোর পর থেকেই সরাসরি বাজারে ওপর আঘাত হানছে পানির তোড়। বর্তমানে বাজারের কিছু অংশে বাঁশ, বালুর বস্তা ও জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে পাড় রক্ষার চেষ্টা চলছে।

​একই অবস্থা তালা উপজেলার বালিয়া গ্রামসহ কপোতাক্ষ নদ তীরের এলাকাগুলোতে। জোয়ারের পানি বাড়লেই বাঁশে ও বস্তায় ভর করে রাত জেগে বাঁধ পাহারা দেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে বালিয়া, শুভংকরকাঠি, তেঘরিয়া ও শ্রীমন্তকাঠি গ্রামের শত শত বাড়িঘর, কৃষিজমি ও মাছের ঘের প্লাবিত হতে পারে।

​সম্প্রতি আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহুনিয়া এলাকায় কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধে ফাটল ধরে বড় একটি অংশ ধসে পড়ে। খবর পেয়ে স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমে ও পাউবোর সহায়তায় জিও ব্যাগ ফেলে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও ধস ঠেকানো যায়নি। মূল বাঁধ বিলীন হওয়ার পর পেছনে জিও টিউব দিয়ে রিং বাঁধ তৈরি করে আপাতত জোয়ারের পানি ঠেকানো হয়েছে। প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালী জানান, তাঁদের ইউনিয়নে অন্তত তিন কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। জোড়াতালি না দিয়ে স্থায়ী ও শক্ত বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানান তিনি।

​পাউবোর তথ্য মতে, আশাশুনির কাকবাসিয়া, বিষ্ট, মনিপুর, কুড়িকাহুনিয়া, রুইয়ের বিল, বন্যাতলা, ঝাপা এবং শ্যামনগরের পশ্চিম পাতাখালি, কামালকাটি, কালীবাজার, চাউলখোলাসহ বেশ কিছু পয়েন্টের বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া বিভাগ-১-এর আওতায় ইছামতী নদীর সীমান্তবর্তী এলাকা, কালিন্দী-রায়মঙ্গলের সংযোগস্থল, কৈখালী, হরিনগর ও খোলপেটুয়া নদীসংলগ্ন একাধিক স্থান ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করা হয়েছে।

​বিভাগ-১-এর আওতায় ৩৮৩ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে ৮টি স্থানের প্রায় চার কিলোমিটার এবং বিভাগ-২-এর আওতায় ২৯৭ কিলোমিটারের মধ্যে ৩৭ দশমিক ১৮ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ।

​ভাঙন প্রতিরোধে আগাম সংস্কারের পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকার কথা স্বীকার করেছেন পাউবোর কর্মকর্তারা। পাউবো বিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাশিদুল ইসলাম জানান, সাধারণ বাঁধ ভাঙার উপক্রম হলে বা ভেঙে পানি ঢ়ুকলে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করা হয়। তবে বাঁধের আগাম স্থায়ী সংস্কারের জন্য যে বরাদ্দ প্রয়োজন, তা অপ্রতুল। উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি) দ্বিতীয় পর্যায়ে সংস্কার পরিকল্পনা থাকলেও সেটির দীর্ঘায়িত প্রক্রিয়ার কথা জানান তিনি।

​অন্যদিকে, পাউবো বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. গোলাম যাকারিয়া জানান, তাঁদের দুটি চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় ৭০ শতাংশ। তবে গত চার-পাঁচ বছরে জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিল থেকে কোনো বরাদ্দ পাননি তারা। ভবিষ্যতে তহবিল পেতে নতুন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির পরিকল্পনা চলছে।

​সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব আলীনুর খান গণমাধ্যমকে বলেন, বিপর্যয় ঘটার পর জরুরি মেরামতের পেছনে না ছুটে আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো চিহ্নিত করে সংস্কার করা প্রয়োজন। আগাম প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদার না করলে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জানমাল ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে