মাঠভর্তি হাজারো দর্শক। চারপাশে উৎসুক মানুষের ভিড়। মাঝখানে দুই গ্রামের কুস্তিগীরদের শক্তি, কৌশল আর নৈপুণ্যের লড়াই। প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, উত্তেজনা আছে, কিন্তু নেই হিংসা-বিদ্বেষ। বরং খেলা ঘিরে দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে গড়ে উঠছে বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধন। সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী ‘ভাইয়াফি’ কুস্তি যেন হয়ে উঠেছে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার এক অনন্য মাধ্যম। শরৎ ও হেমন্ত এলেই ভাটি অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে শুরু হয় এই কুস্তির আয়োজন। এক গ্রামের মানুষ আরেক গ্রামের মানুষকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসেন। মেহমানদের জন্য চলে ব্যাপক আপ্যায়ন। দুপুরের খাবার শেষে শুরু হয় কুস্তির লড়াই। শত শত, কোথাও হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ। গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দের আবহ। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের গৌরারং গ্রামের মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এমনই এক ভাইয়াফি কুস্তি। জামালগঞ্জ উপজেলার নয়াহালট গ্রামের সঙ্গে গৌরারং গ্রামবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রীতি লড়াই দেখতে জড়ো হন হাজারো মানুষ। অতিথি হিসেবে আসা নয়াহালট গ্রামের কয়েক শ মানুষের আপ্যায়নে দুটি গরু জবাই করেন গৌরারং গ্রামের বাসিন্দারা। দুপুর ১২টার দিকে শুরু হওয়া এই আয়োজনে কুস্তিগীরদের শক্তি ও কৌশল দেখতে দর্শকদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। স্থানীয় ভাষায় কুস্তিগীরদের বলা হয় ‘মাল’। তাঁদের লড়াই চলে কয়েকটি ধাপে। প্রথম ধাপ ‘ফনার খেলা’ বা উন্মুক্ত পর্ব। এরপর ‘সানি দাগা’ বা বাছাই পর্ব। সবশেষে অনুষ্ঠিত হয় ‘দাগার খেলা’ বা চূড়ান্ত পর্ব। প্রতিটি ধাপেই চলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই। শেষ পর্যন্ত বিকেল ৫টার দিকে সমতার মধ্য দিয়ে শেষ হয় খেলা।এই খেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক শুধু কুস্তিগীরদের শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং মাঠজুড়ে মানুষের শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতেও গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের সময় মাঠে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। খেলার বিচারকদের স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘আমিন’। তাঁরা লড়াই পরিচালনা করেন এবং সিদ্ধান্ত দেন। মাঠভর্তি দর্শক সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেন। আয়োজকদের ভাষ্য, এই খেলাকে কেন্দ্র করে সাধারণত মারামারি বা বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটে না; বরং মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ আরও দৃঢ় হয়।ভাটি অঞ্চলের মানুষের কাছে ভাইয়াফি কুস্তি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সামাজিক সম্পর্ক জোরদার করারও একটি উপলক্ষ। কোনো কোনো এলাকায় গ্রামের মানুষের মধ্যে বিরোধ বা দূরত্ব তৈরি হলে এ ধরনের প্রীতি কুস্তির আয়োজন করা হয়। এক গ্রামের মানুষ অন্য গ্রামের মানুষকে আমন্ত্রণ জানান, একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেন, খেলা উপভোগ করেন। এতে দূরত্ব কমে, সম্পর্কের উন্নতি হয় এবং সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি হয়।ভাটি বাংলা কুস্তি ফেডারেশনের সভাপতি নুরুল হক আফিন্দী বলেন, ‘কুস্তি আমাদের এলাকার অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা। এটি শুধু বিনোদন নয়, সম্প্রীতিরও খেলা। এক গ্রামের মানুষ অন্য গ্রামের মানুষকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসেন। একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেন, আনন্দ করেন। এভাবে মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।’তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে হাওরাঞ্চলের অনেক মানুষের হাতে কাজ থাকে না। অবসর সময়ে তাঁরা এই খেলার আয়োজন করেন। কৃষিকাজ শুরু হলে খেলা বন্ধ থাকে। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে তাঁরা কাজ করছেন। কুস্তিকে স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ক্রীড়া সংস্থায় আবেদনও করেছেন তাঁরা। তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে নুরুল হক আফিন্দী আরও বলেন, ‘বর্তমানে তরুণদের একটি অংশ ইন্টারনেট ও মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। আমরা চাই, তারা মাঠে আসুক, খেলাধুলা করুক এবং সুস্থ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হোক। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই খেলা চালু রেখেছেন। আমরাও চাই, পরবর্তী প্রজন্ম এই ঐতিহ্য ধরে রাখুক।’ ভাইয়াফি কুস্তিকে ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্কেরও একটি বিশেষ চিত্র দেখা যায়। কুস্তিগীরদের পাশাপাশি তাঁদের সঙ্গে আসা অতিথিদের আপ্যায়নে গ্রামের মানুষ সম্মিলিতভাবে অংশ নেন। আয়োজনের জন্য গরু-খাসি জবাই করা হয়। গ্রামের মানুষ একে অপরের বাড়িতে যাতায়াত করেন। খেলা শেষ হলেও রাতভর চলে আনন্দ-উৎসব। এতে এক গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের মানুষের পরিচয় ও সম্পর্ক আরও গভীর হয়। বৃহস্পতিবারের খেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভাটি বাংলা কুস্তি ফেডারেশনের সভাপতি নুরুল হক আফিন্দী। বিশেষ অতিথি ছিলেন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালিক। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান, প্রিন্সিপাল নূরুজ আলী, ইউপি সদস্য ছালিক মিয়া, অ্যাডভোকেট শহিদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম পলাশ, মানবাধিকারকর্মী নুরুল হাসান আতাহেরসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।