বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় অবশেষে হত্যা মামলা করেছেন তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে উত্তরখান থানায় মামলাটি করা হয়েছে। তবে তাহসিফের সঙ্গে সর্বশেষ দেখা হওয়া বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে মামলায় আসামি করা হয়নি। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন, তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিব মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। নৌ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিমও জানান, তাহসিফের বাবা হত্যা মামলা করেছেন। মামলার এজাহারে দীপের ডাকে তাহসিফ বাসা থেকে বের হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁকে সরাসরি আসামি করা হয়নি।
ঘটনার পর থেকেই মামলা করার বিষয়ে অনীহার কথা জানিয়েছিলেন তাহসিফের বাবা। মামলা হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি বলেছিলেন, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে বলে তাঁর বিশ্বাস। মামলা করলে আদালতে যাতায়াতসহ নানা ঝামেলায় পড়তে হবে বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, সরকার দায়িত্ব নিয়ে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
তবে শেষ পর্যন্ত ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নিলেন তিনি। মামলাটি তদন্ত করবে নৌ পুলিশ। নৌ পুলিশের এসপি মাসুমা আক্তার জানিয়েছেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে দীপ মোটরসাইকেল নিয়ে তাহসিফের বাসার নিচের গ্যারেজে আসেন। সেখানে নিজের হেলমেট মোটরসাইকেলে রাখার পর পোশাক দিয়ে চোখ-মুখ মুছতে দেখা যায় তাঁকে। কিছুক্ষণ পর তাহসিফ নিচে নেমে এলে দুজন হাত মেলান। সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে তাঁদের আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে করে চলে যেতে দেখা যায়।
পরিবারের কাছে দীপ জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা হওয়ায় তাঁরা একটি ওয়ার্কশপে গিয়েছিলেন। মোটরসাইকেল ঠিক করার পর একসঙ্গে খাবার খেয়ে তিনি আলাদা হয়ে যান। দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় তাঁদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়।
পরদিন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাহসিফের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা শেষে ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ অক্টোবর সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। সেটি নম্বরপ্লেটবিহীন কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০। মাদক স্পট হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় তাহসিফের সঙ্গে মধ্যরাতে যাওয়ার কথাও স্বীকার করেন দীপ।
পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীপ জানিয়েছেন, মঙ্গলবার গভীর রাতে তাঁরা ওই এলাকায় অবস্থান করার সময় পুলিশের একটি দল তাঁদের ধাওয়া করে। তখন তিনি তুরাগ নদীর তীরে বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে গিয়ে লুকান। আর তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন। পরে সুযোগ বুঝে সেখান থেকে সরে গিয়ে রাত আড়াইটার দিকে নিজের বাসায় ফেরেন দীপ।
তবে গভীর রাতে তাঁরা সেখানে কেন ছিলেন, সে বিষয়ে তদন্তকারীরা বিস্তারিত কিছু জানাননি। পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান জানিয়েছিলেন, দীপের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার রাতে দীপকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। নৌ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম জানান, দীপ তাঁদের হেফাজতে রয়েছেন এবং তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এখনো তাঁকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। তদন্তে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।