সরকার যখন মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে, ঠিক তখনই সাতক্ষীরায় ১ হাজার ৯৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৫০টি ভবনে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পাঠদান চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষক-কর্মচারী ও ৩৬ হাজার কোমলমতি শিক্ষার্থীর জীবন প্রতিনিয়ত সংশয়ের মধ্যে রয়েছে। পুরোনো এসব ভবনের মরিচাপড়া টিন, জরাজীর্ণ দেওয়াল এবং ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ার চরম ঝুঁকির মধ্য দিয়েই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। জীবনহানির শঙ্কায় এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রমান্বয়ে কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। তবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ ২৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং দ্রুতই নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
সাতক্ষীরা সদরের কুলতিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হুমায়ুন কবির জানান, ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির ভবন নির্মিত হয় ২০০৩ সালে। দীর্ঘ ২৩ বছরে ভবনের অবস্থা একেবারেই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ছাদের পলেস্তারা ও দেওয়ালের প্লাস্টার খসে বেরিয়ে গেছে ইটের দেওয়াল। পাশাপাশি বর্ষায় স্কুল মাঠে পানি জমার কারণে স্কুলে আসার রাস্তাটিও জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে। তিনি আরও জানান, হাজারো সংকট আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর ভালো ফলাফল ও বৃত্তি পাওয়ার পরও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তিনি দ্রুত নতুন স্কুল ভবন নির্মাণের জোরালো দাবি জানান।
অন্যদিকে, সাতক্ষীরা শহরের দক্ষিণ ঘোষপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্রও প্রায় একই রকম। তবে ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি হওয়ায় বিগত নির্বাচনে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে সামান্য কিছু সংস্কারকাজ করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন। সদরের পশ্চিমে অবস্থিত কুলপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহাজান আলী জানান, বহু পুরোনো এই স্কুলটি ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হলেও আজও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। নিচু এলাকার টিনশেডের এই ভবনটির টিন ও কাঠের ফ্রেম সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এমনকি পর্যাপ্ত বেঞ্চের অভাবে প্লাস্টিকের টুলে বসে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে হয়। বৃষ্টি বা রোদের সময় শ্রেণিকক্ষের ভেতরেও বাইরে মতো অবস্থা তৈরি হয় এবং বর্ষায় স্কুলটি সম্পূর্ণ ডুবে থাকে। গরমের দিনে বাধ্য হয়ে গাছের তলায় পাঠদান চালাতে হয়। এভাবেই জেলার অন্তত ২৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কুলতিয়া স্কুলের শিক্ষাকার্যক্রম চলছে, যার ফলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা স্কুল চলাকালীন সব সময় শঙ্কার মধ্যে থাকেন। রোদ ও বর্ষার ভোগান্তি নিত্যসঙ্গী। ভবন ও যাতায়াতের রাস্তার সংকটের কথা তুলে ধরে কুলপোতা স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও নানা আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। শহরের ঘোষপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ছাদ বা ফ্যান খসে পড়ার মতো দুশ্চিন্তায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। সাতক্ষীরার এই জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ২৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবিলম্বে নতুন ভবন নির্মাণ করা না হলে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ কোমলমতি শিশুদের জীবন রক্ষা এবং অভিভাবকদের আতঙ্ক দূর করতে সরকার অতি দ্রুত এসব স্কুলের ভবন নির্মাণ করবে-এমনটাই প্রত্যাশা অভিভাবক ও সচেতন মহলের। এসব বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমীন বলেন, সাতক্ষীরায় ১ হাজার ৯৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ২৫০টি স্কুলের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের প্রায় দেড় হাজার শিক্ষক ও ৩৬ হাজার শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকিতে রয়েছেন। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এসব স্কুলের নতুন ভবন নির্মিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি আরও জানান, অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো সরকারের জরুরি তহবিল থেকে প্রাপ্ত সীমিত অর্থ দিয়ে সামান্য মেরামত করে কোনো রকমে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যা কোনোভাবেই শংকামুক্ত নয়।