ফলাফল প্রকাশের সেই চিরচেনা আবেগ ও উচ্ছ্বাস হারিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তির ভিড়ে

এফএনএস (এস.এম. শহিদুল ইসলাম; সাতক্ষীরা) : | প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম
ফলাফল প্রকাশের সেই চিরচেনা আবেগ ও উচ্ছ্বাস হারিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তির ভিড়ে

একসময় পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিনটি ছিল শিক্ষার্থীদের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ও আবেগঘন একটি দিন। ফলাফল প্রকাশের নির্ধারিত সময়ের আগেই শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠত কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণ। কারও চোখেমুখে থাকত কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের স্বপ্ন, কারও মনে অজানা শঙ্কা, আবার কেউ কেউ বুকভরা আশা নিয়ে অপেক্ষা করত প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নোটিশ বোর্ডের সামনে। কখন ফলাফল প্রকাশ হবে, কখন নিজের রোল নম্বরটি খুঁজে পাওয়া যাবে-এমন উৎকণ্ঠা আর অধীর অপেক্ষায় কাটত দীর্ঘ সময়।

ফলাফল প্রকাশের মুহূর্তে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি হতো এক অন্যরকম পরিবেশ। কেউ কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বন্ধুদের জড়িয়ে ধরত, কেউ আবার আশানুরূপ ফল না পেয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলত। বন্ধুদের মধ্যে চলত একে অপরের ফলাফল জানার প্রতিযোগিতা। কেউ মিষ্টি বিতরণ করত, কেউ আনন্দে চিৎকার করে উঠত, আবার কেউ হতাশ বন্ধুটির কাঁধে হাত রেখে সাহস জোগাত। শিক্ষক, সহপাঠী ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে সৃষ্টি হতো আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না আর আবেগের এক মিশ্র অনুভূতি।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে ফলাফল জানার সেই চিরচেনা দৃশ্যপট। আধুনিক প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন আর ফলাফল জানার জন্য শিক্ষার্থীদের কলেজ কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটে যেতে হয় না। সরকারি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে বসে কিংবা যেকোনো স্থান থেকে স্মার্টফোনের মাধ্যমে কয়েক মুহূর্তেই জেনে নেওয়া যাচ্ছে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল। ওয়েবসাইট, এসএমএস ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ফলাফল জানার সুযোগ তৈরি হওয়ায় আগের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও চোখে পড়ে না।

প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে আমাদের জীবনকে সহজ করেছে। সময় ও শ্রম বাঁচিয়েছে, ফলাফল জানার প্রক্রিয়াকে করেছে দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। তবে এই সহজলভ্যতার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষাজীবনের কিছু মূল্যবান স্মৃতি, কিছু চিরচেনা আবেগ এবং বন্ধুত্বের এক অনন্য মুহূর্ত। একসময় ফলাফল প্রকাশের দিনটি ছিল শুধু নম্বর কিংবা জিপিএ জানার দিন নয়; এটি ছিল বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার, একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার, দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক আরও গভীর করার একটি উপলক্ষ।

আজ শিক্ষার্থীরা মোবাইলের পর্দায় নিজের ফলাফল দেখে হয়তো আনন্দিত হচ্ছে, হয়তো হতাশও হচ্ছে; কিন্তু সেই অনুভূতি ভাগ করে নেওয়ার জন্য পাশে থাকছে না আগের মতো একঝাঁক বন্ধু। নেই কলেজ প্রাঙ্গণে দলবেঁধে ছুটে চলা, নেই নোটিশ বোর্ডের সামনে ভিড়, নেই ফলাফল জানার পর বন্ধুদের উচ্ছ্বসিত চিৎকার, নেই মিষ্টিমুখের আয়োজন। আনন্দ কিংবা হতাশা-সবকিছুই যেন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে একটি মোবাইলের ছোট্ট পর্দায়। প্রযুক্তি আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু তার পাশাপাশি কেড়ে নিচ্ছে জীবনের কিছু সহজ-সরল আনন্দময় মুহূর্তও। হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কলেজের নোটিশ বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করার গল্পগুলো হয়ে থাকবে কেবল অতীতের স্মৃতি। অথচ এই অপেক্ষা, উৎকণ্ঠা, আনন্দ, কান্না আর বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোই ছিল শিক্ষাজীবনের এক অমূল্য অধ্যায়।

প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই প্রয়োজন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাও জরুরি। তবে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করতে গিয়ে যেন আমরা মানবিক সম্পর্ক, সামাজিক বন্ধন ও জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলো হারিয়ে না ফেলি। কারণ মোবাইলের পর্দায় ফলাফল দেখা যায় ঠিকই, কিন্তু কলেজ প্রাঙ্গণে বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া সেই আনন্দ, সেই উচ্ছ্বাস আর সেই আবেগের অনুভূতি কোনো প্রযুক্তি দিয়ে পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। সময় বদলেছে, বদলেছে ফলাফল জানার পদ্ধতি; কিন্তু বদলে যাওয়া সময়ের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষাজীবনের এক মধুর অধ্যায়-যার নাম ফলাফল প্রকাশের দিনের সেই চিরচেনা উচ্ছ্বাস।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে