ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামা, ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস সংকুচিত হওয়া এবং তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলে পানিসংকট তীব্র হচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টরা।
তাঁরা বলছেন, কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি খাল-বিল ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং কম পানিনির্ভর ফসলের আবাদ বাড়ানো প্রয়োজন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) দিনব্যাপী রাজশাহীতে ‘বরেন্দ্র অঞ্চল রক্ষা’ শীর্ষক এক নীতিসংলাপ অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘ইয়ুথ ইন রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ’ জাতিসংঘ মানবাধিকার, ওয়াটারএইড, সুইসকন্ট্যাক্ট এবং সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের সহযোগিতায় এ সংলাপের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের পরিচালক অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রতিবছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর শূন্য দশমিক ১ থেকে শূন্য দশমিক ৬ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। এ অঞ্চলে প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার ৫৪ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি উত্তোলন করা হয়। সেচের পানির প্রায় ৯০ শতাংশই আসে ভূগর্ভ থেকে। এ কাজে প্রায় ১৫ হাজার গভীর নলকূপ ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪০ দশমিক ৮ ডিগ্রি এবং ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ছিল প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র গরমে ২০২৪ সালে রাজশাহী বিভাগে হিটস্ট্রোকে ৬৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নওগাঁ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কয়েক দশক ধরে সেচনির্ভর কৃষির সম্প্রসারণের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কার্যক্রম একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার জন্য সমন্বিত নীতিমালা প্রয়োজন। তিনি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর ও খাল খনন এবং কৃষকদের সেচের পানির সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) নির্বাহী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে কাজ করছে বিএমডিএ। পদ্মা নদী থেকে পানি এনে নিয়ামতপুর, তানোর ও নাচোলসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বিএমডিএর খনন করা সরকারি পুকুরগুলো সেচ ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণের কাজে ব্যবহারের জন্য কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনাতেই রাখা প্রয়োজন। কিন্তু এসব পুকুর অন্য কাজে ইজারা দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হলেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিএমডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, বেসরকারি পর্যায়ে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। অনেকে যথাযথ তদারকি ছাড়াই পাম্প স্থাপন করছেন। আবার পানি বিতরণের অদক্ষ ব্যবস্থার কারণে প্রচুর পানি অপচয় হচ্ছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবিবা বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট শুধু নারীদের সমস্যা নয়; এটি মানব উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সামগ্রিক সংকট। এর প্রভাব নারী, পুরুষ ও শিশু—সবার ওপর পড়ছে।
তিনি বলেন, ফারাক্কা, তিস্তা ও মহানন্দাসহ বিভিন্ন নদীতে উজানে বাঁধ ও প্রতিবন্ধকতার কারণে ভাটির অঞ্চলে পানির প্রাপ্যতা কমেছে। অন্যদিকে বড় পরিসরে খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম অব্যাহত না থাকায় পানি সংরক্ষণের সক্ষমতাও কমে গেছে।
রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে পানির সংকট নিয়ে গবেষণাভিত্তিক মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একেক উপজেলায় পানিসংকটের ধরন একেক রকম। তাই সব এলাকায় একই ধরনের সমাধান কার্যকর হবে না। এলাকাভিত্তিক সমস্যা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জলবায়ুজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ অঞ্চলে খাল খনন এবং বিএমডিএর কার্যক্রম জোরদার করতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তিনি পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য একটি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানান। এ পরিকল্পনার আওতায় শুকিয়ে যাওয়া খাল ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার এবং পদ্মা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত জলাধার নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেন। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি এসব জলাধারে সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহারের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন তিনি।
সংলাপে শুষ্ক মৌসুমে ফসলের বৈচিত্র্য আনা, সেচের দক্ষতা বাড়ানো, বর্ষার পানি সংরক্ষণ এবং মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়িয়ে আর্দ্রতা ধরে রাখার সুপারিশ করা হয়।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের সহকারী পরিচালক রওফা খানম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক কাজী রবিউল আলম এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক পারভেজ আজহারুল হক বক্তব্য দেন।