শীত এখনো পুরোপুরি জেঁকে বসেনি। তবে প্রকৃতিতে বইতে শুরু করেছে শীতের আগমনী হাওয়া। ভোরের হালকা কুয়াশা আর হিমেল বাতাস জানান দিচ্ছে শীতের উপস্থিতি। আর শীতের এই আগাম বার্তাতেই দিনাজপুরের হিলি, নবাবগঞ্জ, বিরামপুর, হাকিম পুর, ঘোড়া ঘাট উপজেলার গ্রামাঞ্চলে শুরু হয়েছে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির তোড়জোড়। মাটির চুলায় জ্বলছে টাটকা খেজুরের রস। সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু গুড়, পাটালি ও লালি।
উপজেলার আশপাশের গ্রামগুলোতে এখন চোখে পড়ছে গাছিদের কর্মব্যস্ততা। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি খেজুরগাছে ঝুলছে মাটির হাঁড়ি। ভোরের আলো ফোটার আগেই গাছ বেয়ে হাঁড়ি নামিয়ে রস সংগ্রহ করছেন গাছিরা। পরে সেই রস বড় কড়াইয়ে জ্বাল দিয়ে তৈরি করছেন শীতের ঐতিহ্যবাহী খেজুরের গুড়। আর টাটকা গুড়ের স্বাদ নিতে ভিড় করছেন স্থানীয় ক্রেতারাও।
নবাবগম্জের দাউদপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাটির তৈরি বিশাল চুলায় বড় কড়াই বসিয়ে একটানা জ্বাল দেওয়া হচ্ছে খেজুরের রস। আগুনের তাপে ধীরে ধীরে ঘন হচ্ছে রস। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে খেজুরের গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণ। কেউ রস সংগ্রহ করছেন, কেউ চুলায় জ্বাল দিচ্ছেন, আবার কেউ তৈরি গুড় বাজারজাত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এখানে গুড় তৈরির কাজে ব্যস্ত ছয়জন গাছির সবাই রাজশাহীর বাঘমারা উপজেলার বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে হযরত আলী (৪৫), জাকির হোসেন (৪২), জাহিরুল হক (৩৮), রফিক উদ্দিন (৪৪), মানিক হাসান (৪৫) ও হাজির আলী (৩৮), তহিদুল ইসলাম (৩৫) রয়েছেন। টানা চার বছর ধরে শীত মৌসুমে তাঁরা দাউদপুর এলাকায় এসে খেজুরের গুড় তৈরি করছেন।
গাছি মো. হযরত আলী জানান, এ বছর ২৩২টি খেজুরগাছ চুক্তিতে নিয়ে রস সংগ্রহ করছেন তাঁরা। আশ্বিন মাসের ২২ তারিখে নবাবগঞ্জে এসেছেন। কার্তিক মাস থেকেই শুরু করেছেন গুড় তৈরির কাজ। বাপ-দাদার কাছ থেকেই এ পেশার হাতেখড়ি। বছরের প্রায় পাঁচ মাস দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করেন। বাকি সময় নিজ এলাকায় কৃষিকাজ ও ছোটখাটো ব্যবসা করেন।
তিনি বলেন, ‘বাপ-দাদার কাছ থেকে এই কাজ শিখেছি। দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে চুক্তিতে খেজুরগাছ নিয়ে রস নামিয়ে গুড় তৈরি করে বিক্রি করি। খেজুরের গুড় তৈরি করাই আমাদের মূল মৌসুমি ব্যবসা।’
হযরত আলী জানান, একটি গাছ থেকে শুরুতে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই কেজি রস পাওয়া যায়। পরে তা বেড়ে তিন থেকে চার কেজি পর্যন্ত হয়। মৌসুমের শুরুতে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ কেজি গুড় তৈরি হচ্ছে। রসের পরিমাণ বাড়লে দৈনিক উৎপাদন এক থেকে দুই মণ পর্যন্ত পৌঁছায়। বর্তমানে প্রতি কেজি গুড় পাইকারি ২৩০ টাকা এবং খুচরা ২৬০ টাকায় বিক্রি করছেন তাঁরা।
শীতের সঙ্গে বাঙালির খাবারের ঐতিহ্যেও ফিরে আসে খেজুরের গুড়। এই গুড় দিয়ে পিঠা, পায়েস, মুড়ি-মুড়কি, ক্ষীরসহ তৈরি হয় নানা মুখরোচক খাবার। তাই শীতের আগেই টাটকা খেজুরের গুড় কিনতে আগ্রহ বাড়ছে ক্রেতাদের। চিনির তুলনায় দাম কিছুটা বেশি হলেও স্বাদ ও ঘ্রাণের কারণে খেজুরের গুড়ের চাহিদা রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
গুড় কিনতে আসা স্কুলশিক্ষক মো. নুরুল হক বলেন, ‘কার্তিক মাস থেকেই শীতের আমেজ শুরু হয়েছে। শীত মানেই পিঠা-পায়েস, আর এসব খাবারে খেজুরের গুড়ের স্বাদই আলাদা। গাছিরা আমাদের সামনেই রস সংগ্রহ করছেন এবং গুড় তৈরি করছেন। তাই নির্ভেজাল ও টাটকা গুড় কিনতে এখানে এসেছি।’
নবাবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, কয়েক দিন আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিধান কান্তি হালদারকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গাছিদের গুড় তৈরির কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন। তাঁদের তৈরি গুড় সুস্বাদু এবং স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিধান কান্তি হালদার বলেন, গাছিদের স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে গুড় তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সেভাবেই গুড় তৈরি করছেন।