দেশের বিমানবন্দরগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে পাখি। দেশের সব বিমানবন্দরের রানওয়ে ও উড়োজাহাজের উড্ডয়ন পথে পাখি নিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। উড়োজাহাজের ইঞ্জিন বা গুরুত্বপূর্ণ অংশের সঙ্গে পাখির সংঘর্ষ হলে ফ্লাইট বিলম্বসহ জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়। পাশাপাশি উড়োজাহাজের ক্ষতি ও অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণেও খরচ হয়। কিন্তু বিমানবন্দর এলাকায় পাখির উপদ্রব ও বার্ড স্ট্রাইক নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেই। বিমানবন্দরগুলোতে পাখি নিয়ন্ত্রণে রাখার যন্ত্রপাতি নেই। এখনও কিছু বহু পুরনো বার্ড শুটার দিয়েই কাজ চালানো হচ্ছে। কিন্তু তাতেও গুলি, বন্দুক ও প্রশিক্ষিত জনবল নেই। আর শীতকালে বিমানবন্দর ও আশপাশে পাখির আনাগোনা বেশ বেড়ে যায়। তখন পাখিবিষয়ক দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। এ নিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বেশি চিন্তিত। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, শীত শুরুর পরপরই দেশে বিমান চলাচলের নিরাপত্তায় বার্ডহিটের মৌসুমি ঝুঁকি তৈরি হয়। ওই সময়ে আকাশে পাখির আনাগোনা বেশ বেড়ে যায়। আর পাখির উপদ্রব বাড়লে উড়োজাহাজ চলাচলে নিরাপত্তাঝুঁকিও বাড়ে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই দেশের বিমানবন্দরগুলোতে বার্ডহিট নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। তাতে দেশের সবকটি বিমানবন্দরেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে পাখির উৎপাত। ফলে বাড়ছে উড়োজাহাজের টেকঅফ ও ল্যান্ডিংয়ের সময় বার্ড স্ট্রাইকের ঝুঁকি।
সূত্র জানায়, দেশের প্রধানতম বিমানবন্দর হজরত শাহজালালে দীর্ঘদিন ধরেই অকেজো বার্ড কন্ট্রোল সিস্টেম। আর অভ্যন্তরীণ ৫টি বিমানবন্দরেই নেই কোনো বার্ডশুটার। আর বরিশাল ও যশোরে বিমানবন্দরের সচল বন্দুক থাকলেও অকেজো সৈয়দপুর ও কক্সবাজারের বন্দুক। আর শাহ মখদুমে কিছুই নেই। গৎ তিন বছরে বিভিন্ন বিমানবন্দরে পাখির আঘাতে বিমানের লন্ডনগামী অত্যাধুনিক ড্রিমলাইনারসহ দেশি-বিদেশি একাধিক উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিমানবন্দরে পাখি তাড়ানোর ক্ষেত্রে মনিটরিং ও জোরালো পদক্ষেপ না থাকায় প্রায়ই বার্ড হিটের ঘটনা ঘটার অভিযোগও রয়েছে। তবে সম্প্রতি বেবিচক বিমানবন্দর এলাকায় অস্ত্র কিনতে জেলাপ্রশাসক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি চেয়ে চিঠি দিয়েছে। তাতে শাহজালালে অবÍত ১০টি বন্ধুক কেনার কথা বলা হয়। তাছাড়া শাহ মখদুম বিমানবন্দরেও পাখি ও বন্যপ্রাণী নিয়ন্ত্রণে অস্ত্রের সংকট রয়েছে। তাছাড়া কোনো কোনো বিমানবন্দরে কুকুর, শিয়াল ও পাখির উপদ্রব বেশি হলেও তাড়ানোর কোনো যন্ত্র নেই। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও পাখি ও বন্যপ্রাণীর ঝুঁকি রয়েছে। রানওয়ের আশপাশে বনজঙ্গল, পুকুর ও ডোবার পাশাপাশি হোটেল, কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগর থাকায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণীর উপদ্রব বেড়েছে। তাতে উড়োজাহাজের সঙ্গে বার্ড স্ট্রাইক ও অ্যানিমেল স্ট্রাইকের ঘটনা ঘটছে। আর যশোর বিমানবন্দরেও ব্যবহার করা হচ্ছে পুরনো বন্দুক।
সূত্র আরও জানায়, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন বিমানবন্দরে পাখির সঙ্গে উড়োজাহাজের সংঘর্ষ ঠেকাতে ব্যবহার হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। অ্যাভিয়ান রাডার, ইনফ্রারেড ও ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর, লেজার, শব্দভিত্তিক ডিটারেন্ট ও স্বয়ংক্রিয় নজরদারির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। রাডারের মাধ্যমে বিমানবন্দরের আশপাশে পাখির অবস্থান, উচ্চতা ও গতিপথ শনাক্ত করে আগেই সতর্ক হওয়া যাচ্ছে। কোথাও লেজার আলো, কোথাও পাখির জন্য বিপদ সংকেত বা নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করে পাখি সরানো হচ্ছে। পাশাপাশি পাখি আকৃষ্ট হয় এমন খাবার, পানি ও আবাসস্থল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বেবিচকের পরিকল্পনায় প্রতি বছর আধুনিক ব্যবস্থার বাজেট বরাদ্দ থাকলেও কাজের কাজ হচ্ছে না। এমনকি কোন খাতে ওই অর্থ ব্যয় হচ্ছে তারও কোনো হদিস নেই। দেশের ৮টি বিমানবন্দরেই একই অবস্থা বিরাজ করছে।
এদিকে বিশ্বের অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বার্ড স্ট্রাইকের ঝুঁকি অনেক বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। অন্যান্য দেশে যেখানে ওই ঝুঁকির হার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে ওই হার ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার নিয়মানুয়ায়ী প্রতিটি বিমানবন্দরে রানওয়ে এলাকাকে পাখিমুক্ত রাখতে আধুনিক শব্দভিত্তিক বার্ড স্কেয়ারার সরঞ্জাম এবং পর্যাপ্ত শটগান থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বাজেট বরাদ্দের অজুহাতে নতুন বন্দুক ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করা হয়নি। অথচ উড়োজাহাজ উড়ার ঠিক আগমুহূর্তে একাধিক উড়োজাহাজের সঙ্গে পাখির সংঘর্ষ হয়েছে। প্রায় সব বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামার সময় উড়োজাহাজের ইঞ্জিনে পাখি ঢুকে ক্ষতি, ফ্লাইট বিলম্ব এমনকি জরুরি অবতরণের ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। তার মধ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। পাখির সঙ্গে উড়োজাহাজের এ সংঘর্ষ শাহ আমানত বিমানবন্দরেরও নিয়মিত ঘটনা।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বেবিচক সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান জানান, বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও জনবলের ঘাটতি রয়েছে। অস্ত্রের লাইসেন্স ব্যক্তির নামে দেয়ার নিয়ম থাকায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে অস্ত্র কেনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে। আশা করা যায় দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধান হবে।