নিরাপদ খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার এবং জনস্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন উদ্বেগজনক এক বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, অনিরাপদ খাদ্যের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৮৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ অসুস্থ হন এবং ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা এ ঝুঁকির সবচেয়ে বড় শিকার। প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই বয়সী শিশুদের খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৯ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও খাদ্যবাহিত রোগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটনার সঙ্গে এ শিশুদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এটি শুধু জনস্বাস্থ্যের সংকট নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ বিকাশের জন্যও বড় হুমকি। খাদ্যবাহিত রোগের ক্ষেত্রে সাধারণত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবীকে প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে রাসায়নিক দূষণের ভয়াবহতা বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ২০২১ সালে খাদ্যজনিত মৃত্যুর ৭৩ শতাংশের জন্য রাসায়নিক ঝুঁকি দায়ী ছিল। বিশেষ করে আর্সেনিক ও সিসার মতো বিষাক্ত উপাদান হৃদ্রোগ, ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে লক্ষাধিক মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ এখন জনস্বাস্থ্য রক্ষার অপরিহার্য শর্ত। এ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক ক্ষতি। খাদ্যবাহিত রোগের কারণে ২০২১ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে শত শত বিলিয়ন ডলারের উৎপাদনশীলতা ক্ষতি হয়েছে। অসুস্থতা, চিকিৎসা ব্যয় এবং কর্মঘণ্টা হারানোর ফলে ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র-সবার ওপরই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। প্রতিবেদনটি আরও দেখিয়েছে যে, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তার সংকট তুলনামূলকভাবে বেশি। এই বাস্তবতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। দ্রুত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত নজরদারি, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ঘাটতি এবং খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনে মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ডব্লিউএইচও যথার্থই বলেছে, খাদ্য নিরাপত্তা কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়; এটি প্রতিটি পরিবার ও প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে জড়িত। তাই সরকার, উৎপাদক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা-সবার সম্মিলিত দায়িত্ব নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। কার্যকর নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা গেলে এ সংকট অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। জনস্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ সুরক্ষার স্বার্থে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাকে এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।