সাতক্ষীরায় 'মব' তৈরি করে শিক্ষককে পিটিয়ে জখম, শ্লীলতাহানির প্রমাণ মেলেনি

এফএনএস (এস.এম. শহিদুল ইসলাম; সাতক্ষীরা) : | প্রকাশ: ৯ জুন, ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
সাতক্ষীরায় 'মব' তৈরি করে শিক্ষককে পিটিয়ে জখম, শ্লীলতাহানির প্রমাণ মেলেনি

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণীর ক্লাস চলাকালে এক ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে এক সহকারী শিক্ষককে শ্রেণীকক্ষে চড়-থাপ্পড় ও পরে শিক্ষক মিলনায়তনে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে জখম করার ঘটনা ঘটেছে। উত্তেজিত জনতার (মব) হাত থেকে ওই শিক্ষকের জীবন বাঁচাতে পরে তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়। সোমবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সদর উপজেলার ৩৮ নং ইন্দিরা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই ঘটনা ঘটে।

তবে ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার স্থানীয় বাসিন্দা ও কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে শ্লীলতাহানির কোনো প্রমাণ বা সত্যতা পাওয়া যায়নি।

মঙ্গলবার সকালে ইন্দিরা গ্রামে গিয়ে জানা যায়, ঈদের ছুটির পর রোববার ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। দুপুর ১২টার দিকে সপ্তম শ্রেণীতে গণিত ক্লাস নিচ্ছিলেন শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বোর্ডে একটি অঙ্ক কষতে দিলে শিক্ষার্থীরা তা খাতায় করে শিক্ষকের টেবিলে জমা দেয়।

অভিযোগকারী ছাত্রীর বাবা (যিনি পেশায় একজন চা-বিক্রেতা) দাবি করেন, তাঁর মেয়ের খাতা তিনবার বলার পর বেঞ্চে এসে ফেরত দেওয়ার সময় ওই শিক্ষক তাঁর মেয়ের শ্লীলতাহানি করেন। বিষয়টি রোববার বিকেলে বাড়ি ফিরে মেয়েটি তার মাকে জানালে পরিবার তা জানতে পারে। এরপর স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি জানিয়ে সোমবার সকাল পৌনে নয়টার দিকে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আজগার আলী সরদারকে মৌখিকভাবে জানানো হয়।

ছাত্রীর বাবার অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক বিষয়টি গুরুত্ব না দেওয়ায় তিনি স্থানীয় লোকজন ও বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে সকাল ১০টার দিকে বিদ্যালয়ে যান। ক্লাস চলাকালেই তিনি ওই শিক্ষককে চড় মারেন। পরে স্থানীয় কিছু লোক শিক্ষক মিলনায়তনে ঢ়ুকে ভারী বস্তু ও লোহার রড দিয়ে শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানের মাথা ফাটিয়ে দেয়।

তবে মঙ্গলবার ঘটনার বিষয়ে সপ্তম শ্রেণীর কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানায়, রোববার ক্লাসে সহপাঠীর সঙ্গে মোস্তাফিজ স্যারের কোনো খারাপ আচরণ বা অপ্রীতিকর ঘটনা তারা দেখেনি। কিন্তু সোমবার হঠাৎ করেই ওই সহপাঠীর বাবা ক্লাসে ঢ়ুকে স্যারকে মারধর শুরু করেন।

জানতে চাইলে আগরদাঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান কবীর হোসেন মিলন বলেন, "ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সম্মান এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে সকলের সঙ্গে আলোচনা করে কোনো মামলা করা হয়নি।"

যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও আহত শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে তাঁর স্ত্রী (যিনি কাশেমপুরের একটি মাদ্রাসার শিক্ষক) স্বামীর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচার দাবি করেছেন।

ইন্দিরা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আজগার আলী সরদার জানান, বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত মোট ৪৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বা শিক্ষা কর্মকর্তাদের জানানোর নিয়ম রয়েছে।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, "সোমবার সকালে ছাত্রীর বাবা আমাকে বিষয়টি জানানোর পর আমি তাকে বিদ্যালয়ে আসতে বলি। কিন্তু সকাল ১০টার দিকে ওই অভিভাবক শতাধিক বহিরাগত লোক নিয়ে বিদ্যালয়ে চড়াও হন। তারা জোরপূর্বক কক্ষে ঢ়ুকে মোস্তাফিজ সাহেবকে মারধর করেন। পরে তিনি শিক্ষক মিলনায়তনে এলে বহিরাগতদের একজন লোহার রড দিয়ে তাঁর মাথা ফাটিয়ে দেয়।"

তিনি আরও বলেন, "উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সোহাগ হোসেন, সদর প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) বিষয়টি জানানো হয়। মূলত উত্তেজিত জনতার হাত থেকে ওই শিক্ষকের জীবন বাঁচাতেই দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।" এই ঘটনার পর বিদ্যালয়ের ১৭ জন শিক্ষকের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। কয়েকজন শিক্ষক হতাশ হয়ে দ্রুত এই বিদ্যালয় থেকে বদলি হয়ে যাওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও শিক্ষক বলেন, ইদানীং শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের হয়রানির অভিযোগ বাড়ছে। তবে দিনদুপুরে ভরা ক্লাসের ভেতর এমন শ্লীলতাহানির অভিযোগ বিশ্বাস করা কঠিন। তাঁদের আশঙ্কা, স্থানীয় কিছু বেসরকারি বা বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং মাদ্রাসার স্বার্থে এই বিদ্যালয়টিকে পরিকল্পিতভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হতে পারে, যাতে অভিভাবকেরা আতঙ্কিত হয়ে সন্তানদের অন্য প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যান। গত দুই বছরে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫২০ থেকে কমে ৪৪০-এ নেমে এসেছে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, "কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানানো যেত। কিন্তু তা না করে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে 'মব' সৃষ্টির মাধ্যমে শিক্ষককে নির্যাতন করা সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার পরিপন্থী। এতে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়।" তিনি আরও জানান, আহত শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানকে তিন দিনের ছুটি দিয়ে চিকিৎসাধীন রাখা হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে ইউএনও এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ মাসদুর রহমান বলেন, "এই ঘটনায় কোনো লিখিত অভিযোগ না পাওয়ায় সোমবার সন্ধ্যায় ওই শিক্ষককে সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।"

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে