বাংলাদেশ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর সম্প্রসারণে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে আরও ১১টি নতুন বিমান কেনার চুক্তি করেছে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় নিউইয়র্কের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে এ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন ও পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
মাহদী আমিন বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আরও ১১টি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তি করেছে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক, পররাষ্ট্র দপ্তরের উপ-সচিব ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ, বাণিজ্য দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি উইলিয়াম কিমিট এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরসহ দেশটির কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
মাহদী আমিন জানান, দেশের বিমান চলাচল খাতের সম্প্রসারণের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন রুট চালুর পরিকল্পনাসহ এ খাতের সম্প্রসারণের কারণে বিমানের বহরে নতুন উড়োজাহাজ প্রয়োজন হচ্ছে।
তিনি বলেন, বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে এয়ারবাসের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে। দেশের চাহিদা ও প্রয়োজন বিবেচনা করেই উড়োজাহাজ কেনা হবে।
এর আগে ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি করেছিল। ওই চুক্তির মূল্য ছিল ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। নতুন ১১টি উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বোয়িং থেকে বাংলাদেশের পরিকল্পিত উড়োজাহাজ কেনার সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২৫টিতে।
তবে নতুন ১১টি উড়োজাহাজের কোন মডেল কেনা হবে, দাম, অর্থায়নের শর্ত এবং সরবরাহের সময়সূচি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি। একই সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার একটি প্রস্তাবও বিবেচনা করছে।
চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বোয়িং ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আরও ১১টি বিশ্বমানের বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ কেনার এ চুক্তি দুই দেশের সম্পর্কের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন এবং এতে উভয় দেশই উপকৃত হবে।
পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, সরকার জাতীয় স্বার্থ ও দেশের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। বিমান চলাচল খাতে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে এ খাত আরও সমৃদ্ধ হবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশের বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নিউইয়র্কে বিভিন্ন বৈঠকও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সফরের দ্বিতীয় দিনে স্বাস্থ্য, কৃষি, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে বৈঠকে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে সহযোগিতা, কৃষকদের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে জাতিসংঘের অধিবেশনের সাইড ইভেন্টে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সেখানে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ ছিল। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। মিয়ানমারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের জন্য জবাবদিহির বিষয়ও আলোচনায় আসে।
বাংলাদেশে থাকা ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার প্রসঙ্গ তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় এ সংকটে চাপ বাড়ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন ও ভারতের ভূমিকা নিয়েও বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় পর্যায়ে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হওয়ায় দেশটির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, কূটনীতিতে সব দরজা ও বিকল্প খোলা রাখতে হয়। সংলাপ কখনো বন্ধ করা যায় না।
ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অভিবাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ এ সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। বন্ধুত্বপূর্ণ ও নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সংলাপের উদ্যোগে সহায়তা করার সুযোগ থাকলে বাংলাদেশ তা করতে পারে বলেও জানানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জ্বালানি, বাণিজ্য ও বাংলাদেশি প্রবাসীদের ওপর প্রভাব ফেলছে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়।
এ ছাড়া জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন, নদী ও খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, নবায়নযোগ্য ও সৌর জ্বালানির ব্যবহার এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
চার দিনের জাতিসংঘ সফরে প্রধানমন্ত্রীর আরও কর্মসূচি রয়েছে। এ সময় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় বক্তব্য দেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে।
নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, শামা ওবায়েদ, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতীকুর রহমান রুমনসহ প্রেস উইংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন।