আট মাসে ৯২৪ জনকে হত্যা পাঞ্জাব পুলিশের, কী ঘটেছে সেখানে?

এফএনএস বিদেশ : | প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম
আট মাসে ৯২৪ জনকে হত্যা পাঞ্জাব পুলিশের, কী ঘটেছে সেখানে?

পাকিস্তানের সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ পাঞ্জাবে গত আট মাসে ৯০০-এর বেশি মানুষ তথাকথিত ‘পুলিশ এনকাউন্টারে’ নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, এটি নিছক অপরাধ দমন নয়, বরং রাষ্ট্রের মদতে পরিচালিত একটি সুপরিকল্পিত ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নীতি’।

হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তান (এইচআরসিপি)-এর এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গত নভেম্বরে দক্ষিণ পাঞ্জাবের বাহাওয়ালপুরে জুবাইদা বিবির বাড়িতে এক অভিযান চালায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের (সিসিডি) সশস্ত্র কর্মকর্তারা। জুবাইদার অভিযোগ, পুলিশ তার বাড়ি থেকে নগদ টাকা, গয়না এবং মেয়ের বিয়ের যৌতুক লুট করার পাশাপাশি তার ছেলেদের তুলে নিয়ে যায়।

মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে জুবাইদার তিন ছেলে ও দুই জামাই পুলিশের গুলিতে নিহত হন। পুলিশ একে ‘এনকাউন্টার’ বললেও জুবাইদার স্বামী আব্দুল জব্বার দাবি করেন, নিহত তরুণদের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না; তারা সবাই ছিলেন সাধারণ কর্মজীবী মানুষ। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরীফের ‘নিরাপদ পাঞ্জাব’ রূপকল্প বাস্তবায়নে গত বছরের এপ্রিলে গঠিত হয় ক্রাইম কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট (সিসিডি)। কিন্তু এইচআরসিপির মতে, এই বিশেষায়িত বাহিনীটি বর্তমানে একটি ‘সমান্তরাল পুলিশ বাহিনী’ হিসেবে কাজ করছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত ৬৭০টি এনকাউন্টারে মোট ৯২৪ জন নিহত হয়েছেন। যেখানে ২০২৪ সালে সারা দেশে এনকাউন্টারে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৪১।

একক একটি প্রদেশে ৮ মাসে এই বিশাল নিহতের সংখ্যা গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর দায়ের করা পুলিশ এফআইআর-এর ভাষা প্রায় একই রকম। সবখানেই দাবি করা হয়—সন্দেহভাজনরা মোটরসাইকেলে যাচ্ছিল, পুলিশ থামালে তারা আগে গুলি চালায় ও আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি ছুড়লে তারা নিহত হয়। এইচআরসিপি একে ‘কপি-পেস্ট কাঠামো’ বলে অভিহিত করেছে। এমনকি প্রতিবেদনে এমন অলৌকিক দাবিও দেখা গেছে যে, মৃতপ্রায় সন্দেহভাজন ব্যক্তি গুলি খাওয়ার পর সুস্থ হয়ে নিজের নাম-ঠিকানা ও অপরাধের দীর্ঘ ইতিহাস অফিসারদের কাছে স্বেচ্ছায় বয়ান করছেন।

রাজনৈতিক দায়মুক্তি ও বিচারহীনতা

মানবাধিকার আইনজীবী আসাদ জামালের মতে, উন্নত গোয়েন্দা তথ্য বা ফরেনসিক তদন্তের পরিবর্তে রাজনৈতিক চাপের মুখে ‘সংক্ষিপ্ত পথে’ অপরাধ দমনের এই পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ অপরাধ কমার দাবি করলেও এইচআরসিপি বলছে, রাষ্ট্র অনুমোদিত এই সহিংসতা বিচারব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। পুলিশের সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা ও দুর্বল বিচার ব্যবস্থার কারণে পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়, যা এই ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রাষ্ট্র যখন আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে হত্যাকাণ্ডকে ‘শূন্য অপরাধের পথ’ হিসেবে প্রচার করে, তখন কেবল কথিত অপরাধীরাই নয়, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীরাও এই ধরনের বিচারহীন হত্যার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।


আপনার জেলার সংবাদ পড়তে