গণপতি স্যারের পর এবার কার পালা?

রাজু আহমেদ | প্রকাশ: ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ০২:০০ এএম
গণপতি স্যারের পর এবার কার পালা?
রাজু আহমেদ

গণপতি স্যার তাঁর স্ত্রী, পুত্র-কন্যাসহ নিজের ঘরেই খুনের শিকার হয়েছেন। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে বারো বছরের আয়ুশ চক্রবর্তীর জন্য। খুনীরাও হয়তো চিহ্নিত হবে, শাস্তিও হয়তো হবে কিন্তু এমন বর্বরোচিত খুনের ক্ষতিপূরণ কী হবে? চারটে জীবন! কী বীভৎসভাবে বিভীষিকা দিয়ে একে একে গণপতি চক্রবর্তী, স্ত্রী ভোলা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং পুত্র আয়ুশ চক্রবর্তীকে খুন করা হয়েছে- কল্পনা করতে পারছেন? তখন সেই ঘরের পরিবেশ কেমন হয়েছিল? মানুষ কতটা নির্দয় হলে মানুষের খুনী হতে পারে?

মানুষ কতটা উন্মাদ হলে খুন করে সেই বাড়িতেই গোসল করতে পারে, যে জায়গায় খুন করেছে সেই ঘরের টেবিলে বসে খেজুর আর শসা খেতে পারে? পুলিশি তদন্তের প্রাথমিক ভাষ্যে, এ-ই খুনীরা গণপতি স্যারদের পারিবারিকভাবে চেনাই হবে হয়তো! হয়তো নিকট প্রতিবেশীও! নয়তো বাসার ছাদে ইয়াবা সেবন করতে তো দূরের মানুষের আসার কথা নয়! প্রতিবেশীরা ধারণা করছে, ইয়াবা সেবন করতে দেখে ফেলায় গোটা একটা পরিবারকে খুন হতে হলো। গণপতি স্যারের পুরো পরিবারের একজন সদস্যও আর অবশিষ্ট রইলো না। হয়তো স্যার নেশাখোরদের নেশা থেকে প্রতিহত করতে প্রতিবাদ করেছিলেন! সমাজব্যবস্থা এমন অধঃপাতে পৌঁছেছে, কেউ কাউকে ভালো পরামর্শ দিলে তাকেও শত্রু ভাবা হয়!

আপনি ভাবতে পারছেন, এই বাস্তবতায় আপনি-আমিও কি সত্যিই নিরাপদ? সারাদেশেই তো ছড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা। শহর থেকে গ্রামে বন্যার পানির মতো বিস্তৃত হয়ে ইয়াবার চালান! গাঁজার পর ইয়াবা এবং আধুনিক মাদকের যা যা আছে সবকিছুই সারাদেশের সকল নগর-বন্দরের অন্দরে অনায়াসে পাওয়া যায়! নাগরিক সুবিধার অনেককিছুই গ্রামে না মিললেও নেশা করা যায় এমন কোনো কিছুরই অভাব এখন আর গ্রামে নাই! শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরাও সমানে ঝুঁকছে, ডুবছে নেশার জগতে। কেবল বয়স্ক কিংবা মধ্য-বয়স্করা নন বরং অল্প বয়স্করাই মাদকের জালে জড়িয়েছে বেশি। আমরা হারিয়ে ফেলছি রাষ্ট্রের আগামীর সম্ভাবনা।

দেশের বহু অপরাধ, খুন-জখম, চুরি-ছিনতাই ও সহিংসতার পেছনে মাদক গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। মাদক মানুষের বিচারবোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক আচরণকে ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে। অনেকটা বিকৃত মস্তিষ্কের অসুস্থ মানুষে পরিণত করে। পারিবারিক অশান্তি, মা-ছেলেতে দ্বন্দ্ব, বাবা-মেয়েতে দূরত্বের ক্ষেত্রে অনেকাংশেই মাদক দায়ী। যে পরিবারে অন্তত একজন মাদকসেবী আছে সে পরিবারের অন্য সদস্যরা জানে এর অশান্তি কত নির্মম, ভয়াবহতা কত গভীর! সমাজও নেশার কুফল জানে কিন্তু আমাদেরকে সময়ে সময়ে গণপতি স্যারদের হারিয়ে বিলাপ করতে হয় কিন্তু সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয় না! ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয় আবার জামিন পায়! গণপতি স্যাররা একবারে হারায়, আর ফিরে আসে না!

যে মাদক মানুষের শরীর, মস্তিষ্ক, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করছে, সেটিই যখন হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়- তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, আমরা আসলে কীভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণ করছি? অথচ দেশের সর্বত্র হাত বাড়ালেই ইয়াবাসহ নেশাজাত যাবতীয় উপকরণ মিলছে! আসল ইয়াবা, নকল ইয়াবা- বাজারে সয়লাব। মাদকের ক্রেতা অসংখ্য। এতে তরুণ সমাজ ধ্বংস হচ্ছে, দেশ রসাতলে যাচ্ছে- তাতে কার কতটুকু মাথাব্যথা? অথচ ইয়াবার পাচার রোধ করা যাচ্ছে না। প্রতিবেশী দেশের সীমানা থেকে বন্যার ঢলের মতো দেশের সীমানায় ইয়াবা প্রবেশ করে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এই চেইনে আছে অসংখ্য ডিলার, খুচরা বিক্রেতা। সেবনে আগ্রহী গ্রহীতা অগণিত। কোনো কোনো সমাজের সর্বত্রই মাদকসেবী মিলবে! পত্রপত্রিকায় ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও এসেছে। কাজেই গণপতি স্যারদের মতো সচেতন ও নিরস্ত্র মানুষদেরও অপরাধীদের সামনে অসহায় করে তুলছে বিদ্যমান ব্যবস্থাই।

মাদকের নেশা ও আসক্তি মানুষের বিচারবোধকে এমনভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে যে ভয়াবহ অপরাধও তাদের কাছে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় না। তাদের কাছে মা-বোনও নিরাপদ না। চুপ থাকলে আপনার আমার সন্তান এই সংক্রমণে আক্রান্ত হবে। কাজেই রাষ্ট্রের কাছে কাকুতি ভরা আকুতি, ইয়াবাসহ সকল মাদকের চালানকে প্রাথমিক সুযোগেই নস্যাৎ করে দিন। দেশে মাদকবিরোধী চেইন তৈরি করুন। মাদক নির্মূলে এমন দক্ষ জনবল নিয়োগ করুন যারা নিজেরাও চরিত্র ও চিন্তায় মাদকবিরোধী! নয়তো মাদকের এই আগ্রাসন থেকে আমাদের কেউ রক্ষা পাবে না। ইতোমধ্যে মাদকের যে বিস্তার ঘটেছে সেটাই একটা জাতিকে ব্যর্থ ও ধ্বংস করে দিতে যথেষ্ট।

পরিবারসহ গণপতি স্যারের জীবনহানি আমাদের বিবেক আর বোধকে জাগ্রত করুক। নয়তো আমাদের সম্মিলিত পরিণতিও গণপতি স্যারের পরিবারের মতোই হবে! হয়তো একদিন আমাদেরও জীবন দিয়ে এর মূল্য দিতে হবে, নয়তো বেঁচে থেকেই এই ব্যর্থতার দায় বহন করতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে