পরিপূর্ণ সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে আংশিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ তুলে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছেন জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত আইনসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপনের ঠিক আগে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাত ৮টা ৫ মিনিটের দিকে তারা অধিবেশন কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম কার্যদিবসে এ ঘটনা ঘটে। অপর বিলটি ছিল হস্তান্তর সম্পত্তি (সংশোধন) বিল, ২০২৬। বিলগুলো উত্থাপনের আগে ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ওয়াকআউটের ঘোষণা দেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বৃহস্পতিবার বেসরকারি সদস্যদের কার্যাবলীর জন্য নির্ধারিত দিন। এদিন মন্ত্রীর বিল উত্থাপন করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। একই সঙ্গে একাধিক বেসরকারি বিল বিচারাধীন থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মন্ত্রীর বিল এনে সংসদ সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা দরকার।
শফিকুর রহমান বলেন, “প্রাইভেট মেম্বার ডে-তে মন্ত্রীর বিল উত্থাপন করা যায় কি না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। তাছাড়া একাধিক বেসরকারি বিল এখনো বিচারাধীন রয়েছে। এখানে মন্ত্রীদের বিল এনে সংসদ সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে না?”
তিনি আরও বলেন, “এটি ভালো দৃষ্টান্ত নয়। বেসরকারি সদস্যদের দিনটি শুধু তাদেরই প্রাপ্য। আমরা এই আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে ইচ্ছুক নই।”
বিরোধীদলীয় নেতা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না হওয়া নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, সংসদকে একপেশে করে ফেলা হচ্ছে এবং সংস্কারের মূল দাবিকে পাশ কাটিয়ে খণ্ডিতভাবে কিছু সংস্কার এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, “সংসদকে ঠেলে একপেশে করে ফেলা হচ্ছে। আমরা নীতিগতভাবে এই ধরনের বিলে অংশগ্রহণ করতে চাচ্ছি না। আমরা আশঙ্কা করছি এর মাধ্যমে সংস্কারের মূল দাবি সেটাকে চাপা দেওয়া হচ্ছে। আমরা এর পক্ষে নাই।”
বিল উত্থাপনের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “আমরা এভাবে খণ্ডিত সংস্কারের অংশ হতে চাই না, আমরা ওয়াকআউট করছি।”
এরপর জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
ওয়াকআউটের পর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বিরোধী দলের সদস্যদের সংসদে ফিরে এসে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ওয়াকআউট করার স্বাধীনতা সদস্যদের রয়েছে, তবে সংসদের ভেতরেই সব বিষয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, “ওয়াকআউট করার স্বাধীনতা আপনার আছে। কিন্তু সংসদের ভেতরে সবকিছু আলোচনা করা দরকার। না হলে জাতি কী পাবে? আমি অনুরোধ করব আপনারা বসেন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। পক্ষ-বিপক্ষ বিতর্ক থাকবে। বিতর্কের মধ্যে দিয়েই তো জাতি পরিচালিত হবে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও সংসদকে প্রাণবন্ত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, “আমাদের উচিত সংসদকে প্রাণবন্ত রাখা এবং তুচ্ছ বিষয়ে ওয়াকআউট না করা।”
সরকারি ও বিরোধী দলের মতপার্থক্য ও বিতর্ক সংসদ কক্ষেই হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, যেকোনো সিদ্ধান্তের মীমাংসাও সংসদের ভেতরেই হওয়া প্রয়োজন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে এসব অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হয়। এগুলো অনুমোদন বা অননুমোদনের শেষ সময় ছিল ১০ এপ্রিল।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে সংসদে আনা হয়নি। ফলে সেগুলো কার্যকারিতা হারায়। আরও সাতটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়।
গুম প্রতিরোধ, পুলিশ কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশসহ যেসব ১৬টি অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ে বিল আকারে আনা হয়নি, সেগুলো আরও যাচাই-বাছাই করে নতুন বিল আনার কথা জানিয়েছিল সরকার। এর মধ্যে ছিল গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ।
অন্যদিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ রহিত করে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পুনঃপ্রচলনের জন্য প্রথম অধিবেশনে একটি বিল পাস করা হয়েছিল। তখন সরকার আইনটি আরও শক্তিশালী করতে অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের কথা জানিয়েছিল।
এর ধারাবাহিকতায় গত ৩ আগস্ট গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া অনুমোদন করা হয় ১০ আগস্ট।
এই দুটি খসড়া অনুমোদনের পর মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন পক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করে। খসড়ার কয়েকটি বিষয় নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।