পাবনার চাটমোহরে বসেছিলো পুঁথিপাঠের আসর। প্রায় ৩০০ বছর আগে শুরু হওয়া মুসলিম সমাজে সৃষ্ট এক সাহিত্য ভাষা,যা এখন বিলুপ্ত হয়ে ঠাই নিয়েছে বইয়ের পাতায়।
চাটমোহরের এক ঝাঁক সাহিত্যপ্রেমি তরুনদের উদ্যোগে উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম সোনাহারপাড়ায় কিতাব প্রামানিকের বাড়ির উঠানে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাত ৯টায় বসেছিল পুঁথি পাঠের এই আসর। হারিয়ে যাওয়া লোকজ সাহিত্য ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পুঁথি পাঠের আসরের আয়োজন করা হয় । আকাশে চাঁদ আর কুপি বাতি ও হারিকেনের নিভু নিভু আলোয় গায়েন তার মায়াবি সুরের জাদুতে মাতোয়ারা করেন উঠোনে মাদুর বিছিয়ে গোল করে বসা শ্রোতাদের।
চাটমোহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের আলোকিত মানুষ আসাদুজ্জামান দুলাল ছিলেন এই আসরের মধ্যমণি। তিনি পাঠ করলেন পুঁথি “বিবি সোনাভান”। আসরে গ্রামীণ গায়েন মোঃ লইমুদ্দিন প্রামাণিক পাঠ করেন “গাজিকালু ও চাম্পাবতী”। পুঁথি পাঠের এই আসরে কোন অতিথি ছিলেন না। কাউকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণও জানানো হয়নি। প্রচারণা চলেছে আসরের হাতে লেখা পোস্টারের মাধ্যমে আর ফেসবুকে। পুঁথিপাঠের খবরটি এসেছিল দৈনিক ইত্তেপাকসহ কয়েকটি জাতীয় ও আঞ্চালক দৈনিকে। এটুকুই,ব্যস। পুরো উঠোন ভরে উঠেছিল নারী-পুরুষে। ঢাকা থেকে এসেছিলেন চলচ্চিত্রের সাউন্ড প্রকৌশলী রিপন নাথ। ছিলেন চাটমোহরের সা্কংৃতিক অঙ্গনের কিছু কর্মী আর সাংবাদিক।
পুঁথি পাঠের আসর আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন সজল বিশ্বাস,ডাঃ আতিক,বিপ্লব আচার্য্য,নিয়ামুল মুক্তা,প্রভাষক আব্দুল মান্নান,অম্লান ভট্টাচার্য,সৌরভ কুন্ডু, শুভ কর্মকারসহ সোনাহারপাড়া গ্রামের অনেকে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে সম্মাননা প্রদান করা হয় আসাদুজ্জামান দুলাল,লইমুদ্দিন প্রামানিক ও ওসমাণ গণিকে। রাহ ১১টা অবধি চলা এই আসরে সবাই যেন বিমুগ্ধ হয়ে পড়েন।
ডাঃ আতিক বলেন,পুঁথি পাঠের আসরে পাঠ করা হতো,আমীর হামজা,শাহনামা,আলেফ লায়লা,হাতেমতাই,কমলা সুন্দরীর পুঁথি,দেলদার কুমার ও শাহজাদী দিল পিঞ্জির কিচ্ছা, জঙ্গনামা,আমির সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরীর পুঁথি,গাজিকালু ও চম্পাবতী কন্যার পুঁথি, তাজকিরাতুল আউলিয়া,কাসাসুল আম্বিয়া,বিবি সোনাভান,ফকির বিলাস,লাইলী মজনু প্রভৃতি । হানিফা,হামজা,হাতেমতাই,সোহরাব-রুস্তম,জৈগুন বিবি প্রমুখ বীর চরিত্র নিয়ে রচিত কাব্যগুলি বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল। কালের বিবর্তনে এবং আকাশ সংস্কৃতির ভয়াল গ্রাসে,আধুনিকতার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য পুঁথি পাঠের আসর আজ বিলুপ্তির পথে। তিনি জানান,উপমহাদেশে পুঁথি সাহিত্য শুরু হয়েছিল পপ্রায় আঠারো শতকে। আনুমানিক ১৬৮০-১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে হুগলির বালিয়া-হাফেজপুরের কবি ফকির গরীবুল্লাহ এই পুঁথি কাব্যধারার সূত্রপাত করেন আমীর হামজা রচনার মধ্য দিয়ে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে পুঁথির বত্রিশ শতাংশ শব্দ ছিল বিদেশী। মধ্যযুগে প্রায় পাঁচশ বছর ধরে বাংলা ভাষার যে সাহিত্যরীতি চলে আসছিল,তার থেকে এটা সম্পূর্ণ আলাদা। ধারণা করা হয় পুঁথি সাহিত্যের উৎস ছিল কলকাতা, হাওড়া,হুগলি ও চব্বিশ পরগনা অঞ্চলের মানুষের কথ্যভাষা। সময়ের পালাবদলে পুঁথি সাহিত্য সেই চাহিদা না থাকলেও এখনো কেউ কেউ ধরে রেখেছেন সেই চর্চা। আমরা এই চর্চাকে জাগ্রত করতেই আসরের আয়োজন করেছি।
আসরে আসা জেমান আসাদ বললেন,‘আসাদুজ্জামান দুলাল পুঁথি পাঠ শুরু করার আগেই চারপাশের আলো নিভিয়ে, গোটাকতক মশাল,হারিকেন আর কুপি বাতির আলোয় সুর করে পড়ে যাচ্ছেন,মাথার ওপর তখন ভরা যৌবনের চাঁদ...সামগ্রিক মূল্যায়নে আয়োজনটা চমৎকার। আয়োজকেরা আবহ আনার জন্য বেশ কষ্ট করেছেন বোঝা যায়। দূরপথ পাড়ি দিয়ে যত মানুষ উপস্থিত হয়েছেন,মানুষের এই স্মৃতির কাছে ফেরার আগ্রহ তৈরীর কৃতিত্ব আয়োজকদের দিতে হবে। দর্শকরা বললেন,আজ মানুষ যেভাবে সাড়া দিয়েছে,এই যে মানুষের আগ্রহ,এ আগ্রহ তৈরীর দায় হিসাবে এ আয়োজনের ধারাবাহিকা রক্ষা করার বিয়টা আয়োজকেরা বিবেচনা করবেন।