নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী লক্ষ্ণীপাশা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন, বিদ্যালয়ের সম্পদ ও সম্পত্তি সংরক্ষণ এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন অসঙ্গতি নিরসনের লক্ষ্যে অভিভাবক ও এলাকার সুধীজনদের নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিদ্যালয়ের সভাপতি মোঃ সাজ্জাদ হোসেন শিকদারের সভাপতিত্বে এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কামরুল হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের সম্পত্তির সুরক্ষা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভাপতির বক্তব্যে মোঃ সাজ্জাদ হোসেন শিকদার বলেন, “বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং বিদ্যালয়ের সম্পদ ও সম্পত্তির স্বার্থ সংরক্ষণে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যালয়ের স্বার্থে কিছু অসঙ্গতি নজরে এসেছে। এগুলো কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিরসন করতে চাই। এ কাজে অভিভাবক, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন।”
সভায় বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের অনুপস্থিতির বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়। সভায় বলা হয়, বিদ্যালয়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র বর্তমানে বিদ্যালয়ের হেফাজতে নেই। এসব নথি সাবেক প্রধান শিক্ষক কে এম রেজাউল ইসলামের দায়িত্বকালীন সময়ে তাঁর হেফাজতে ছিল বলে সভায় দাবি করা হয়। এ বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধান শিক্ষক কে এম রেজাউল ইসলামকে নোটিশ দিয়ে বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ফেরত দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানের জন্য জবাব চাওয়া হয়েছিল বলে সভায় জানানো হয়। পরে তাঁর কাছ থেকে একটি লিখিত জবাব পাওয়া গেলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ওই জবাব সন্তোষজনক ও পর্যাপ্ত বলে বিবেচিত হয়নি বলে সভায় জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, বিদ্যালয়ের জমি, সম্পত্তি, রেজুলেশন, হিসাব-নিকাশ, দলিলপত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক ও আইনগত স্বার্থে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। এসব নথিপত্র অনুপস্থিত থাকলে বিদ্যালয়ের সম্পত্তি রক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
সভায় বিদ্যালয়ের জমি সংক্রান্ত বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। বক্তারা অভিযোগ করেন, বিদ্যালয়ের একটি অংশের জমি বিক্রয় বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, বিধি ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। এছাড়া জমি সংক্রান্ত লেনদেনের অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে এবং তার যথাযথ হিসাব বিদ্যালয়ের নথিতে রয়েছে কি না, সে বিষয়েও সভায় প্রশ্ন ওঠে। সভায় অবশ্য বলা হয়, কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করার আগে সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র, রেজুলেশন, হিসাব-নিকাশ, অনুমোদন এবং অন্যান্য নথি যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা হবে। সভায় বক্তারা আরও বলেন, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি ও নথিপত্র ব্যক্তিগত কোনো সম্পদ নয়; এগুলো প্রতিষ্ঠানের সম্পদ। তাই বিদ্যালয়ের স্বার্থে এসব সম্পদ ও নথিপত্র সংরক্ষণ করা সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যালয়ের সভাপতির নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে অনুপস্থিত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের তালিকা প্রস্তুত, অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয়ভাবে উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সাবেক প্রধান শিক্ষক কে এম রেজাউল ইসলামের কাছে বিদ্যালয়ের কোনো গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র থাকলে তা দ্রুত বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত দেওয়ার জন্য পুনরায় আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানানো হবে। প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য প্রদানের জন্য তাকে যথাযথ সুযোগও দেওয়া হবে। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া না গেলে এবং নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে কোনো অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে বিদ্যালয়ের সম্পত্তি ও স্বার্থ রক্ষায় প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সভায় বক্তব্য রাখেন লক্ষ্ণীপাশা আদর্শ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম, নবগঙ্গা ডিগ্রি কলেজের প্রিন্সিপাল মোশাররফ হোসেন মোল্লা, কুন্দসি সরকারি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক কাজী কামরুল হুদা, বিদ্যালয়ের সাবেক ম্যানেজিং কমিটির সদস্য বি. এম. লিয়াকত, সাবেক সদস্য সিরাজুল ইসলাম, স্বাধীন হোসেন, লোহাগড়া প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক সেলিম জাহাঙ্গীর, সাংবাদিক জাহিদুর রহমান জাহাদ সহ অভিভাবক, সাবেক কমিটির সদস্য, শিক্ষক ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
বক্তারা বর্তমান সভাপতির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন, সম্পত্তি সংরক্ষণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং প্রতিষ্ঠানের হারিয়ে যাওয়া বা অনুপস্থিত নথিপত্র উদ্ধারে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ বিষয়ে তারা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
সভায় বক্তারা আরও বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা হয়রানি নয়; বরং দলিলপত্র ও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং বিদ্যালয়ের স্বার্থ রক্ষাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। সভাপতি মোঃ সাজ্জাদ হোসেন শিকদার আরো বলেন, “আমরা চাই বিদ্যালয়ের সুনাম অক্ষুণ্ণ থাকুক, শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হোক এবং বিদ্যালয়ের সম্পদ ও সম্পত্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ থাকুক। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ আইন ও বিধি মেনেই গ্রহণ করা হবে। এ কাজে আমি সকল অভিভাবক, শিক্ষক, সাবেক সদস্য ও এলাকাবাসীর সহযোগিতা কামনা করছি।” সভায় শেষে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি ও নথিপত্র সংরক্ষণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।