পায়রা বিদ্যুৎ প্লান্টের খামখেয়ালীপনার অভিযোগ, জলাবদ্ধতায় ২০০ পরিবার

এফএনএস (কুয়াকাটা, পটুয়াখালী) : | প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম
পায়রা বিদ্যুৎ প্লান্টের খামখেয়ালীপনার অভিযোগ, জলাবদ্ধতায় ২০০ পরিবার

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ১৩২০ মেগাওয়াট পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সীমানা দেয়াল ও বেড়িবাঁধের মাঝখানে বটতলা ও চরনিশানবাড়িয়া গ্রামের দুই শতাধিক পরিবার স্থায়ীভাবে পানিবন্দী দশায় চরম দূরবস্থায় পড়েছেন। গত দশ বছরেও তাঁদের এমন দূরবস্থা কাটেনি। বর্তমানে পানিবন্দীদশায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ দেখা দিয়েছে। সমপ্রতি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়দের কমন অভিযোগ গ্রামের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত ড্রেনেজ খালটি ভরাট করে পওয়ারপ্লান্ট কর্তৃপক্ষ ব্লক দিয়েছে। কিন্তু পানি নিষ্কাশনের কোন পথ করেননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্লান্টের দায়িত্বশীল সূত্র দাবি করে তাঁরা বিষয়টি দেখছেন। মশক নিধন স্প্রে করেছেন। কিন্তু এসব অস্বীকার করছেন স্থানীয়রা। এখন দুই শতাধিক পরিবারের বাড়িঘরে চারদিকে পানিবন্দী রয়েছে। কোথাও হাঁটু সমান, কোথাও কোমর সমান পানি আটকে থাকে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পরিকল্পিতভাবে তাঁদের এই জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়নি। অথচ পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎপ্লান্টের ভিতরের পানিও নামানো হচ্ছে তাদের জমিতে। পানি নিষ্কাশনের প্রকিৃতিক খাল ভরাট করে তাঁদের স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে রাখা হয়েছে।

মধুপাড়া গ্রামের বাসীন্দা মিলন তালুকদার জানান, তাঁদের অন্তত ৫০পরিবারের জমিজমা পাওয়ার প্লান্টের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সবাই এখনো ক্ষতিপুরণের সব টাকা পাইনি। বিদ্যুৎ কোম্পানি এখন তাঁদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। পাওয়ার প্লান্টের সীমানা থেকে বেড়িবাঁধের মাঝখানে যে জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি সেখানে এখনো যেসব পরিবারের বাড়িঘর রয়েছে তাদের ১২ মাস ভোগাচ্ছে। বিদ্যুৎ কোম্পানির (পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের) ভেতরের পানি পাইপ দিয়ে মানুষের জমিতে ফেলা হয় হয়। মধুপাড়া ও চরনিশানবাড়িয়া গ্রামের পানি নিষ্কাশনের খালটি আটকে দেওয়া হয়েছে। ড্রেণেজ ব্যবস্থা করেনি; বরং বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দুই গ্রামের ৬০-৭০ একর কৃষি জমি চাষাবাদ করতে পারছেন না জলাবদ্ধতার কারণে। পানিতে পচন ধরে। মানুষ চলাচল করতে পারছে না। মশার উপদ্রব বেড়েছে। ঘরে ঘরে ডেঙ্গু রোগীর সংক্রমণ। ছেলে-মেয়েরা ঠিকমতো বাড়ি-ঘর থেকে বের হতে পারছে না। নানা ধরনের রোগব্যধি লেগেই থাকে। মিলন তালুকদারের দাবি অন্তত ২০০ পরিবার গত ১০ বছর ধরে এমন কষ্টে জীবন-যাপন করছেন। 

ওখানকার বাসীন্দা অলিউর রহমান নিপু বলেন, ‘ কোন ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই তাঁদের চরনিশানবাড়িয়া ও মধূপাড়া গ্রামের পূর্ব দিকের ২০০ পরিবারের পানি নিষ্কাশনের খালটি বন্ধ করে দেয় বিদ্যুৎ কোম্পানির লোকজন। এরপর থেকে পানি অপসারণ হয় না। উল্টো তাঁদের ভিতরের জমানো পানিও পাইপ দিয়ে আমাদের জমিতে ফেলা হচ্ছে। এসব কারণে এখন বসবাস উপযোগিতা নেই।’ তার ভাষায়, ‘ বিদ্যুৎ প্লান্টের লোকজন এমনভাবে অত্যাচার চালাচ্ছে যে আমরা স্বেচ্ছায় বাড়িঘর ছেড়ে এখান থেকে চলে যাই।’ বহুবার এই সমস্যা সমাধানে বিসিপিসিএল (বিদ্যুৎ কোম্পানি) এর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা কথা বলেছেন। শুধু আশ্বাস দেয়া হয়েছে। কিন্তু সমাধান করা হয়নি বলে জানান তিনি। 

বয়োবৃদ্ধ আবুল কালাম মাস্টার বলেন, ‘আমরা জমিজমা, ঘর-বাড়ি হারিয়েছি পাওয়ার প্লান্টের কারণে। অবশিষ্ট জমি যেটুকু রয়েছে তাও জলাবদ্ধতার কারণে এখন আর চাষাবাদ করতে পারছি না। এমনকি এখন বাড়িতে কেউ সুস্থভাবে বসবাস করতে পারছি না। ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা না করায় এমন দশা হয়েছে বলে এই প্রবীণ মানুষটির অভিযোগ। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, মধুপাড়া গ্রাম থেকে চরনিশানবাড়িয়া গ্রাম পর্যন্ত অধিকাংশ জমিজমা পানির নিচে। বসত ঘরের সামনে-পেছনে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কোথাও হাটু সমান, আবার কোথাও কোমর সমান পানিতে ডুবে আছে। অনেকে চাষাবাদ না করতে পেরে জালের বেড়া দিয়ে মাছের চাষ করছেন। মোট কথা অন্তত ২০০ পরিবারে চলছে দুর্বিষহ অবস্থা। বাস উপযোগিতা নেই। মানুষগুলো এখন হতাশ হয়ে পরেছেন।

এ নিয়ে একাধিকবার বিদ্যুৎপ্লান্টের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললেও তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা বিষয়টি নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করছি। মশক নিধন স্প্রে করা হয়েছে। পাওয়ার প্লান্ট থেকে যে পানি বাইরে যাচ্ছে তাতে সমস্যা হয় না। তবে পানি অপসারণের মূল ড্রেণ করার কথা তাঁরা বললেন। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: আরিফুজ্জামান জানান, তিনি বষয়টি নিয়ে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন। সমাধানের চেষ্টা করবেন। তবে বর্তমানে এ নিয়ে ওখানকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন। তাঁরা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে