বর্ষায় অপরূপ সাজে চলনবিল

এফএনএস (হেলালুর রহমান জুয়েল; চাটমোহর, পাবনা) : | প্রকাশ: ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম
বর্ষায় অপরূপ সাজে চলনবিল

দেশের অন্যতম বৃহৎ বিল চলনবিল এই বর্ষায় (যদিও বর্ষকাল পার হওয়ার পর হয়েছে) সেজেছে নতুন সাজে। অসংখ্য নৌকায় দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ আসছে চলনবিল ভ্রমনে। এ এক অপরুপ চলনবিল। দৃষ্টি যতদূর যাবে,শুধু জলরাশি। মন জুড়িয়ে যায়।

ছবির মত। ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম গহিনে ভেঙ্গে পড়ছে বিশাল বিশাল ঢেউ। দিগন্ত জুড়ে বিশাল জলরাশি। বর্ষায় উন্মুক্ত মাছ,ডিঙ্গি-পালতোলা-ইঞ্জিন চালিত শ্যালো নৌকার বাহারী সব সাজ বাহার। বিনোদন ভ্রমনের নিত্য আয়োজন। আর শুকনো মৌসুমে প্রান্তজুড়ে নানা রকম শস্যে সজ্জিত সবুজের সমারোহ। বিচিত্র প্রকৃতির অপার শোভায় মনপ্রাণ কেড়ে নেয় বিলের গ্রামান্তর। গ্রীষ্ম,বর্ষা,শরৎসহ ষড় ঋতুতেই দেখা মেলে চলবিলের অপরূপ বৈচিত্র্যের নানা মনোমুগ্ধ নিদর্শন। 

‘তাকাই দূরে শুন্য ঘুরে,চিল ফুকারে/গরুর বাথান গোয়ালখানি ঐগো গাঁয়ের ঐ সীমানা।’ ছন্দে যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত’র পুস্পরেনুতে গ্রামের সীমানার গোয়াল গরুর বাথান এখন পানিবন্দি। যে দিকে চোখ যায় শুধুই জলরাশি। সে বিস্তৃত জলরাশি বুকে ঢেউ ভাঙ্গার খেলা। মাঝে মধ্যে দিগন্ত রেখায় সবুজের  আলপনা। এরমধ্যে ঢেউ ভেঙে ছুটে চলেছে যান্ত্রিক শ্যালো নৌকা। আছে মাছধরার বিচিত্র আয়োজনও। এটাই বর্ষা মৌসুমের চলনবিল। আসল চলনবিল। চিরায়াত চলনবিল। যে বিলে নিকট অতীতে সারাবছর পানি থাকতো। জীব-বৈচিত্রের বিপুল সমাহারে, বেনোজলের ঘেরাটোপের ভেতরে ছিল প্রাণোচ্ছল চলনবিল,আর বিল জীবন।

চলনবিল দেশের বিস্তৃত এক জলাভূমির নাম। পাবনা-সিরাজগঞ্জ-নাটোর জেলার বিস্তৃীর্ণ এলাকা জুড়ে এ বিলের অবস্থান। শুকনো মৌসুমে বিলের আয়তন অনেক কমে গেলেও তা প্রাণ ফিরে পায় বর্ষাকালে। তাই ভ্রমণ পিপাসুদের বর্ষা মৌসুমে চলনবিল হয়ে উঠেছে উপযুক্ত গন্তব্য।

হাতছানি দেয়,চলে এসো। আমায় ভালোবাস। মানুষ মানুষে কাছাকাছি হয়। সমপ্রীতির বন্ধন শেকড়ে নিয়ে যায়। সৌহার্দ্য এনে দেয় বিলের পরিবেশে। সকল ধর্ম-বর্ণ,নানা পেশাজীবী মানুষের সহাবস্থান চলনবিলের মানুষের মন মননের শেকড়ে-বাকড়ে। ‘এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী-জননী। ফুলে ও ফসলে কাদামাটি জলে ঝলমল করে লাবনি।’ কবি কাজী নজরুলের এই গানই মনে করিয়ে করে দেয় বিলের চিরায়ত অপরূপের রুপ লাবণ্য।  বৃহৎ বিচিত্র রুপের জলাধার চলনবিল। জলের চলমানতায় নামকরণ হয়েছে চলনবিল। এখন বর্ষাকাল হওয়ায় বিলটি ফিরে পেয়েছে তার চিরচেনা রূপ-রুপায়ন। যদিও শুকনো মৌসুমে বদলে যায় সবকিছু। প্রয়োজনের তাগিদেই ভাসমান মানুষ গুলো ডিঙি নৌকায় ছুটে চলেছে দিগ্বিদিক। দ্বীপের মত গ্রামগুলো যেন একেকটা ভাসমান বাজার। বর্ষায় এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম,এক পাড়া থেকে অন্যপাড়া, গ্রাম থেকে শহর,স্কুল-কলেজ, হাট-বাজারসহ যোগাযোগের সব জায়গায় ভাসমান মানুষগুলোর নিত্য সাথীই যেন ঐতিহ্যবাহী ডিঙি নৌকা। 

বর্ষা এলেই চারদিক অথৈই জলে ডুবে যায় বেনোজলে। মাঠ-ঘাট রাস্তাঘাট, ঘরগৃহস্থালী,বিস্তৃর্ণ এলাকা। আর তখনই দেখা মেলে চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী বাহারী সব ডিঙি নৌকা। কোনোটা চলছে পাল উড়িয়ে,কোনোটা ঠেলা নৌকা,আবার কোনোটা স্টিলের তৈরি ইঞ্জিনচালিত। কারণ চলনবিল এলাকার অধিকাংশ রাস্তাঘাট (সাবমার্চেবল) বর্ষা এলেই পানির নিচে ডুবে যায়। তখন ডিঙি নৌকাই হয় যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম।

চলনবিলের চাটমোহরের বওশা,বোয়ালমারী.হান্ডিয়াল,গুরুদাসপুরের বিলশা,উল্লাপাড়ার উধুনিয়া,ভাঙ্গুড়ার দিলপাশার,পাটুলসহ তাড়াশের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রকৃতি পিয়াসি দর্শনার্থীদের এখন উপচেপড়া ভীড়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসা ভ্রমণতিয়াসি মানুষগুলো একটু নির্মল আনন্দের জন্য ছুটে আসছে চলনবিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পান করতে পরিজন,প্রণয়ীর হাত ধরে। নানান শ্রেণীপেশার মানুষ এখানে এসে ভীড় করছে বিশুদ্ধ বিনোদনের জন্য। যদিবা এখন এ যুগযন্ত্রনার বিশ্বায়ণী সময়ে পরিবেশের সেই বিমলতা মেলে ভার।

চলনবিলের মাঝ দিয়ে ছুটে চলা মহাসড়কের দু’পাশে বিশাল জলরাশি, যেদিকে চোখ যায়, শুধু জল আর জল। ছলাত ছালাত ঢেউ। চোখ মেলে দিলে বিলের ছোটছোট গ্রামগুলো চোখের রেটিনায় ঢুকে পড়ে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসু মানুষ নৌকা,বাস-মাক্রোবাস,মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে ছুটে আসেন চলনবিলকে এক নজর দেখতে। পাাবনার চাটমোহরের বোয়ালমারীর চলবিলীয়ার জলনিসর্গ পাথারে,চাটমোহর-মান্নাননগর মিনি মহাসড়কের বিল আর নদীর মিলনের জলকেলি,হান্ডিয়ালের বুড়োপীরের আস্তানা,শাহী মসজিদ,জগৎশেঠের বাংলো,জগন্নাথ মন্দির হাতছানি দেয় এ বর্ষায়।

নাটোরের গুরুদাসপুরে ‘চলনবিল যাদুঘর’ এ গিয়ে দেখা যাবে বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোর প্রতিচ্ছবি। এখনো দেখা যায় গহনার নৌকা,তালের ডোঙ্গা,কলাগাছের ভেলা(ভুরা),পানসী নৌকা, গরু ও মহিষের গাড়ি, পালকি ও ডুলি, ঘোড়া, সেঁউতি, যাঁতা,বাথান,খরম,হুকা,পাতকুয়া, তফিল ও গাইজা,বাদ্যযন্ত্র, কলের গান, পলো বিভিন্ন দেশের টাকা মুদ্রা,তীর-ধনুকসহ বাহারী সব প্রাচীন তৈজসপত্র। 

এছাড়া সিংড়া উপজেলায় রয়েছে বেদে পল্লী,ঘাঁসি দেওয়ানের মাজার,কবিরগঞ্জ পর্যটন কেন্দ্র (সিংড়া পয়েন্ট)। তাড়াশ উপজেলায় রয়েছে গোবিন্দ নাটমন্দির,বিলসারা বেহুলা লক্ষিন্দরের কূপ,নওগাঁয় শাহ শরিফ জিন্দানী (র.) মাজার শরীফ। চলনবিলের সৌন্দর্যকে আরো আকর্ষণীয় করেছে বালিহাঁস,তিরমূল,বাটুলে,মুরগী হাঁস,খয়রা, মানিক জোড়,ডুটরা,চাপাখি, লোহাড়াং,মেমারচ, বোতক, নলকাক, সাদা বক, কানাবক, ফেফী, ডাহুক, চখা, বকধেনু, ইচাবক, করা, কাছিচোরা, রাতচোরা, ভুবনচিলা, মাছরাঙা, পানকৌড়িসহ নানা প্রজাতির পাক-পাখলি।

চলনবিলের ৮ টি উপজেলার ৬২ টি ইউনিয়ন এবং ৮ টি পৌরসভা নিয়ে বর্তমানে চলনবিল গঠিত। যার গ্রাম সংখ্যা ১৬০০ টি, লোকসংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষাধিক। চলনবিল অঞ্চলে রয়েছে ২১টি নদী ও ৯৩টি ছোটবড় বিল। এখানে রয়েছে নানা শ্রেণীর সুপেয় পানির মৎস্য সম্পদ কৈ, মাগুর,বাচা,রুই,কাতলা,বাটা,মৃগেল, কালবাউস, আইড় গুজাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন এর মধ্যে অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে।

এই বর্ষায় চলনবিল আর নীল আকাশ কিংবা মেঘের আকাশ যেন মিতালী করেছে। এ এক অপূর্ব দৃশ্য। চলনবিলের গোধূলী লগ্নে নৌকার আর বিলের সাথে আকাশ মিশে এক মনোরম পরিবেশের অবতারণা করে। দেখলে মন জুড়াবে।  চলনবিল এখন সেজেছে নতুন সাজে।  

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে