সৈয়দপুরে অসহায় বৃদ্ধার ঘর করে দিলেন শিক্ষক লুৎফর চৌধুরী

এফএনএস (ওবায়দুল ইসলাম; সৈয়দপুর, নীলফামারী) :
| আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম | প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম
সৈয়দপুরে অসহায় বৃদ্ধার ঘর করে দিলেন শিক্ষক লুৎফর চৌধুরী

বয়স ৯০ পেরিয়েছে। স্বামী কোথায়, আছেন কি না তা মনে নেই। নিজের স্থায়ী ঠিকানা কোথায়, সেটিও বলতে পারেন না। সন্তান আছে কি না, থাকলেও তারা কোথায় সেই স্মৃতিও যেন হারিয়ে গেছে বয়সের ভারে। ভিটেমাটি বলতে কিছুই নেই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একটি ভাঙা চালাই যেন তাঁর একমাত্র আশ্রয়। তিনি ভালো রানী দাস।

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার হাজারীহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক কোণে প্রতিষ্ঠানের এক টুকরো জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন এই বৃদ্ধা। বাঁকা একচালা ঘরের চারপাশে পুরোনো কাপড় আর পলিথিন। সেটুকুই তাঁর ঘর, সেটুকুই তাঁর পৃথিবী।

রোদে পুড়ে, গরমে অতিষ্ঠ হয়ে, আবার বৃষ্টিতে ভিজে দিনের পর দিন ও রাতের পর রাত কাটান তিনি। সাম্প্রতিক একদিনের বৃষ্টিতে তাঁর সেই শেষ আশ্রয়টুকুও এলোমেলো হয়ে যায়। ঘরের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়তে থাকে। ভিজে যায় কাপড়চোপড়সহ ঘরের সবকিছু। কোথাও শুকনো জায়গা না থাকায় রাতের পর রাত ঘরের এক কোণে গুটিশুটি মেরে বসে থাকতে হয়েছে তাঁকে।

বৃদ্ধা ভালো রানীর সেই কষ্টের কথা পৌঁছে যায় হাজারীহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ লুৎফর চৌধুরীর কানে। খবর পেয়েই তিনি ছুটে যান বৃদ্ধার সেই ভাঙা ঘরে। সেখানে গিয়ে যে দৃশ্য তিনি দেখেন, তা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। একজন মানুষ জীবনের শেষ বয়সে এসে কতটা অসহায় হলে এমন একটি ভাঙা ঘরে বসবাস করতে পারেন তা যেন নিজের চোখেই দেখলেন অধ্যক্ষ লুৎফর চৌধুরী। তিনি বৃদ্ধার পাশে গিয়ে ভাঙা ঘরের মেঝেতে বসেন। কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থাকেন তাঁর দিকে।

বৃষ্টিতে ভেজা ঘরের এক কোণে গুটিশুটি মেরে বসে ছিলেন ভালো রানী। মুখে কোনো কথা নেই। চোখেমুখে শুধু অসহায়ত্ব। ইশারায় জানালেন, বৃষ্টিতে তাঁর ঘরের সবকিছু ভিজে গেছে। বৃষ্টি নামলেই চাল দিয়ে পানি পড়ে। ঘরে শোয়ার মতো কোনো শুকনো জায়গা থাকে না। তাই রাতের পর রাত এক কোণে বসেই কাটাতে হয়।

মশার যন্ত্রণায় ঘুম আসে না। তার ওপর কখন ঝড়ো হাওয়া এসে শেষ আশ্রয়টুকুও উড়িয়ে নিয়ে যায় সেই ভয়ও তাড়া করে বেড়ায় বৃদ্ধাকে। বৃদ্ধার এমন অসহায় অবস্থা দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি অধ্যক্ষ লুৎফর চৌধুরী। মানবিকতার জায়গা থেকে তিনি তাঁর ঘরটি ঠিক করে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। ভাঙাচোরা চালাটি মেরামত করে দেওয়া হয়, যাতে অন্তত জীবনের শেষ দিনগুলোতে ভালো রানী বৃষ্টিতে না ভিজে একটু নিরাপদে মাথা গোঁজার ঠাঁই পান। একজন শিক্ষকের হাতে শুধু বই-খাতা নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষাও যে থাকে ভালো রানীর পাশে দাঁড়িয়ে যেন তারই দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন অধ্যক্ষ লুৎফর চৌধুরী।

আজও ভালো রানীর কোনো বড় চাওয়া নেই। নেই ঘরবাড়ি, সম্পদ কিংবা স্বজনের সন্ধান। জীবনের শেষ বয়সে তাঁর চাওয়া শুধু একটু নিরাপদ আশ্রয়, বৃষ্টির রাতে শুকনো একটি জায়গা এবং নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সুযোগ। আর সেই ছোট্ট চাওয়াটুকু পূরণ করে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন হাজারীহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ লুৎফর চৌধুরী হয়তো ভালো রানীর জীবনের দীর্ঘ কষ্টের গল্প একদিনে শেষ হবে না। কিন্তু ভাঙা ঘরে বসে থাকা এক অসহায় বৃদ্ধার চোখে স্বস্তির যে আলো তিনি জ্বালিয়েছেন, সেটিই প্রমাণ করে মানুষের পাশে দাঁড়াতে সবসময় বড় কিছু লাগে না, লাগে শুধু একটি মানবিক হৃদয়।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে