চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন পাঁচ দেশের ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন শিক্ষক। একই দাবিতে ৬ষ্ট দিনের মতো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন চুয়েটের শিক্ষার্থীরা। তাঁরা অধ্যাপক সায়েমকে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
গতকাল রোববার বিকেল চারটায় চুয়েটের শহীদ মিনারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি জানান। এর আগে ‘৫৬ তেই কেন’ প্রশ্ন তুলে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। এদিন টানা ষষ্ঠ দিনের মতো শাটডাউন কর্মসূচিও পালন করেন শিক্ষার্থীরা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার হিশাম, মৌমিতা দত্ত প্রিয়া ও রাতুল হাসান। তাঁরা বলেন, অধ্যাপক সায়েম দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক কোলাবোরেশন অফিস, রিসার্চ হাব ও ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় পেলে চুয়েটের শিক্ষা ও গবেষণার পরিসর আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ ছিল।
শিক্ষার্থীরা বলেন, চুয়েট পরিবারের উদ্বেগ, দেশ-বিদেশের অ্যালামনাইদের সংহতি, আন্তর্জাতিক একাডেমিক মহলের সমর্থন এবং অধ্যাপক সায়েমের নেওয়া শিক্ষা ও গবেষণামুখী উদ্যোগ বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি জানান। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেন তাঁরা।
এর আগে রোববার বেলা দুইটায় শহীদ মিনারে ‘৫৬তেই কেন’ প্রশ্নযাত্রা কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। প্ল্যাকার্ড হাতে তাঁরা অধ্যাপক সায়েমকে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় কেন দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো, সে প্রশ্ন তোলেন। পরে শহীদ মিনার থেকে স্বাধীনতা চত্বর পর্যন্ত মিছিল করেন তাঁরা। মিছিল শেষে শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি ও পথনাট্য অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে একই দাবিতে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত উপাচার্য ভবনের সামনে কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন চুয়েটের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। শিক্ষক প্রতিনিধি সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ মাসরুর আহম্মদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা ধারণ করাই তাঁদের মূল দাবি। অচলাবস্থার কারণে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে এবং একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
চুয়েট কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রিয়োতোষ চক্রবর্তী বলেন, ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক সায়েমকে সরিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বাতিল করতে হবে। অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
পাঁচ দেশের ১২ শিক্ষকের সমর্থন
অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন পাঁচ দেশের ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির যন্ত্রকৌশল বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মাসুদ খান, ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ওকলাহোমার অধ্যাপক ও অন্তর্র্বতীকালীন পরিচালক মোহাম্মদ রবিউল হোসেন, নরওয়ের এগডার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৌমেন রুদ্র এবং রবার্ট গর্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমিদ হোসাইন রয়েছেন।
এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নাজমুল হুদা, মারডাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিএম শফিউল্লাহ, ইউনিভার্সিটি অব সানশাইন কোস্টের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক আমান ও, ওয়াশিংটন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও এনআরটি-লিড প্রোগ্রামের পরিচালক প্রশান্ত দত্ত, ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহামের অধ্যাপক মোস্তাফিজ রহমান এবং ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের সিনিয়র প্রভাষক রুপম দাস বিবৃতিতে সমর্থন জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ইউটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুস সালাম এবং ওয়াশিংটন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নন্দিতা বিশ্বাসও বিবৃতিতে সমর্থন জানিয়েছেন।
বিবৃতিদাতাদের মধ্যে জিএম শফিউল্লাহ, সৌমেন রুদ্র, রুপম দাস ও মোহাম্মদ আব্দুস সালাম চুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী। তাঁরা বর্তমানে বিভিন্ন দেশে শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতে গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করে আসছেন অধ্যাপক সায়েম। এ কার্যক্রমের সূত্র ধরেই বিদেশে কর্মরত এসব শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচয় ও যোগাযোগ তৈরি হয়।
ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ওকলাহোমার অধ্যাপক ও অন্তর্র্বতীকালীন পরিচালক মোহাম্মদ রবিউল হোসেন বলেন, অধ্যাপক সায়েমের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে এবং তাঁরা প্রায়ই চুয়েটের প্রাতিষ্ঠানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান ও মানবসম্পদের কারণে চুয়েটের সম্ভাবনা রয়েছে এবং অধ্যাপক সায়েমের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রশাসনিক দক্ষতা বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।
ওয়াশিংটন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও এনআরটি-লিড প্রোগ্রামের পরিচালক প্রশান্ত দত্ত বলেন, বাংলাদেশে কাজ করার অভিজ্ঞতায় শিক্ষার্থীদের সাফল্য ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের প্রতি অধ্যাপক সায়েমের আগ্রহ তিনি দেখেছেন। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা অধ্যাপক সায়েমের মধ্যে রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সানশাইন কোস্টের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক আমান ও বলেন, অধ্যাপক সায়েমের সঙ্গে কাজ ও তত্ত্বাবধানের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, একাডেমিক সহযোগিতা ও গবেষণার সক্ষমতা সম্পর্কে তিনি অবগত। এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি অধ্যাপক সায়েমকে সমর্থন করছেন বলে জানান।
বিবৃতিদাতা শিক্ষকরা বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে চুয়েটের উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবির প্রতি তাঁদের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।