কুড়িগ্রামে ২৫টি চরের মানুষের একমাত্র ভরসা নৌকা

এফএনএস (প্রহলাদ মণ্ডল সৈকত; রাজারহাট, কুড়িগ্রাম) : | প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:০৫ পিএম
কুড়িগ্রামে ২৫টি চরের মানুষের একমাত্র ভরসা নৌকা

শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পাড়ি দিতে হয় প্রায় ৮ কিলোমিটার নদীপথ। চারদিকে পানি, বালু আর বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। বর্ষায় নদীর পানি বাড়লেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা। তখন নৌকাই হয়ে ওঠে চরবাসীর একমাত্র ভরসা। বর্ষায় তিস্তার পানি ও -্রােত বাড়লে সেই পথ হয়ে ওঠে আরও অনিশ্চিত। কোনো দিন নৌকা না পেলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ, জরুরি রোগী হলে শুরু হয় উৎকণ্ঠা। এমন বাস্তবতায় নৌকাই এখন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার তিস্তার চরের মানুষের একমাত্র যোগাযোগের ভরসা।

চারদিকে পানি, বালু আর বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। বর্ষা এলেই মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা। শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে নৌকায় করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় চরবাসীকে। এভাবেই নানা প্রতিকূলতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দ, চর তৈয়বখাঁ, চর হায়বতখাঁ, চর পাড়ামৌলা, চর চতুরা, চর হংসধর, চর রামহরি এবং ঘড়িয়ালডাঙা ইউনিয়নের চর খিতাবখাঁ, চর গতিয়াসাম, চর বগুড়া পাড়া, চর নাখেন্দা, শাওলার চর, চর নামাভরট, মাঝের চর,  চর বড়দারগা, চর বুড়িরহাট, চর বড়ুয়া পাড়া, চর জুম্মার পাড়সহ প্রায় ২৫টি চরের আশপাশের মানুষ।

চরাঞ্চলের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য দু’টি বিদ্যালয় থাকলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়তে হলে তাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। মাঝের চর থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। এর মধ্যে প্রায় ৮ কিলোমিটার নদীপথ নৌকায় পাড়ি দিতে হয়। শুধু নদী পার হতেই সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। বর্ষাকালে পানি ও -্রােত বেড়ে গেলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। এতে কয়েকশ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন জানান, চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কেউ চর ঢ়ুসমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বগুড়া পাড়া সরকারি বিদ্যালয়, খিতাবখাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর খিতাব খিতাবখাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বুড়িরহাট আব্দুস সামাদ মন্ডল দাখিল মাদরাসা, সরকারবাড়ি মাধ্যমিক স্কুল কিংবা সরিষাবাড়ি আলিম মাদরাসায় পড়াশোনা করছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীর ওইপাড়ে হওয়ায় এবং যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না।

বিশেষ করে বর্ষাকালে নৌকা না পাওয়া, নদীর -্রােত এবং ঘাটের সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে তাদের পড়াশোনায়ও প্রভাব পড়ছে।

চর গতিয়াশামের শিক্ষার্থী সুমাইয়া জানায়, প্রতিদিন তাকে যাতায়াতে নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাড়ি থেকে বের হলেও নৌকা পেতে প্রায় ৯/১০টা বেজে যায়। এরপর নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে ১১/১২টা বেজে যায়।

সুমাইয়া বলেন, “এহানে একটি হাইস্কুল হলে আমাদের অনেক সুবিধা হতো। তার আগত নদী খোঁড়া(খনন) দরকার। তাহলে বাড়িঘর ভাঙনের হাত থেকেও অক্ষা(রক্ষা) পাবে।”

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোছা. আর্জিনা খাতুন বলেন, “আমাগো বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। মাঝে মাঝে নৌকা থাকে না। ফলে সেদিন আর স্কুলে আসা হয় না। চরে পড়াশোনার সুবিধা না থাকায় অল্প বয়সে আমাদের মা-বাবা বিয়ে দিয়ে দেন। জীবনের স্বপ্ন থাকলেও সেটি পূরণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।” শিক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবাতেও পিছিয়ে রয়েছে চরাঞ্চলের মানুষ। সেখানে নেই হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসক। কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য কয়েক কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিয়ে মূল ভূখ-ে যেতে হয়। জরুরি রোগীকে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ষাকালে নদীর -্রােত বেশি থাকলে এই সংকট আরও প্রকট হয়।

সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চরাঞ্চলটিতে আনুমানিক দেড় থেকে দুই হাজার মানুষের বসবাস। এর মধ্যে স্কুলপড়-য়া শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ২ হাজার জন। এসব বাসিন্দাকে দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য জনপ্রতি প্রায় ৬০ থেকে ৮০ টাকা নৌকা ভাড়া দিতে হয়।

মাঝের চরের বাসিন্দা আবু তাহের বলেন, আমাগো প্রতিদিন প্রায় ৮ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিয়ে গঞ্জে যেতে হয়। খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সহজে পাওয়া যায় না। তাই একসঙ্গে কয়েক দিনের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে বাড়ি ফিরতে হয়। প্রয়োজনের সময় হাতের কাছে সবকিছু পাওয়া যায় না।চর গতিয়াশামের সাবেক ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের বিভিন্ন সময় সাহায্য-সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। বন্যার সময় ত্রাণ, বস্ত্র, বিশুদ্ধ পানি, টিউবওয়েল ও কোরবানির মাংসসহ বিভিন্ন সহযোগিতা দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে চরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন সমস্যা অনেকটাই কমবে বলে আশা করা যায়। চরের মানুষের দাবি, দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ কমাতে স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপদ নৌযাতায়াত, নৌ এ্যাম্বুলেন্স, দু’টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা জরুরি। বর্ষা এলেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এসব মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ চান তারা।

এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ তানজিলা তাসনিম বলেন, আমরা ডিসি স্যারসহ চরাঞ্চল নিয়ে কাজ করছি। চরের মানুষের জীবনযাত্রার মান কিভাবে উন্নয়ন করা যায় সে জন্য উপজেলার প্রতিটি দপ্তরকে সেখানে কাজ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চরের মানুষের সমস্যাগুলো চিহিৃত করে সমাধানের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরার্মশ করা হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে