সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার অ্যান কারসন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রকাশ: ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:২৯ পিএম
সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার অ্যান কারসন
ছবি: সংগ্রহীত

২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডার কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। ধ্রুপদী সাহিত্য ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃষ্টিশীল সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যে নতুন রূপ তৈরির সাহসী ও উদ্ভাবনী কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সুইডিশ একাডেমি এ বছরের সাহিত্যে নোবেলজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করে।

পুরস্কার ঘোষণার পর রয়টার্স জানায়, কারসনের সাহিত্যকর্মে কবিতা, গদ্য, সংলাপ ও অনুবাদ এমনভাবে মিশে গেছে, যা প্রচলিত সাহিত্যধারার সীমা অতিক্রম করেছে। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য তার সৃষ্টিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। একই সঙ্গে শব্দের ব্যুৎপত্তি, ভাষার গঠন এবং নতুন অর্থের অনুসন্ধান তার লেখার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

সুইডিশ একাডেমির ভাষ্য, কারসনের পুরো সাহিত্যকর্মে ভাষাতত্ত্ববিদের শব্দের প্রতি গভীর আগ্রহ এবং কবির নতুন অর্থের সন্ধানের আকাঙ্ক্ষা এক জায়গায় মিলিত হয়েছে। কারসন নিজেও শব্দের উৎস বা ব্যুৎপত্তিকে তার সৃষ্টিশীল কাজের সূচনা হিসেবে দেখেছেন। ধ্রুপদী গ্রিক থেকে তার অনুবাদগুলোও শুধু অনুবাদ হিসেবে নয়, স্বতন্ত্র সাহিত্যকর্ম হিসেবেই বিবেচিত হয়।

১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোতে জন্ম নেওয়া অ্যান কারসন ১৯৮১ সালে ধ্রুপদী সাহিত্য বিষয়ে ‘Odi et Amo Ergo Sum’ শীর্ষক গবেষণাকর্ম প্রকাশ করেন। দীর্ঘ পেশাজীবনে কবিতা লেখার পাশাপাশি অনুবাদ করেছেন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। তিনি ২০২২ সাল থেকে আইসল্যান্ডের নাগরিকত্বও ধারণ করছেন। বর্তমানে তার বয়স ৭৬ বছর।

প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও পুরাণ কারসনের লেখায় বারবার ফিরে এসেছে। সাফোর খণ্ডিত কবিতার ব্যাখ্যানুবাদ ‘If Not, Winter’ প্রকাশিত হয় ২০০২ সালে। এর আগে সোফোক্লিসের ‘Electra’ ২০০১ সালে এবং ‘Antigone’ ২০১৫ সালে তার রূপান্তরে প্রকাশিত হয়। ইউরিপিদিসের ‘Bakkhai’ও ২০১৫ সালে তার কাজের মাধ্যমে নতুন রূপ পায়।

কারসনের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে ১৯৯৫ সালের ‘Glass, Irony, and God’ বিশেষভাবে আলোচিত। বইটির ‘The Glass Essay’ কবিতাটি তার বহুল প্রশংসিত কাজগুলোর একটি।

১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘Autobiography of Red: A Novel in Verse’ কারসনের সাহিত্যিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। গ্রিক কবি স্তেসিকোরোসের কবিতায় থাকা ডানাযুক্ত লাল রাক্ষস জেরিয়নের চরিত্রকে কেন্দ্র করে তিনি প্রাচীন কাহিনিকে আধুনিক ভাষা, আবেগ ও কল্পনার সঙ্গে মিশিয়েছেন। ধ্রুপদী সাহিত্যকে সমকালীন প্রেক্ষাপটে নতুনভাবে নির্মাণের ক্ষেত্রে বইটি তার স্বাতন্ত্র্যের বড় উদাহরণ।

কারসনের সৃষ্টিশীলতার আরেকটি দিক দেখা যায় ২০১৬ সালের ‘Float’ বইয়ে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখা ২২টি ছোট পুস্তিকার সমন্বয়ে বইটি তৈরি। এগুলো নির্দিষ্ট কোনো ক্রম না মেনেও পড়া যায়। প্রচলিত বইয়ের কাঠামোর বাইরে গিয়ে পাঠকের সঙ্গে ভিন্ন ধরনের সম্পর্ক তৈরির এই প্রবণতা তার লেখার বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।

২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘Wrong Norma’ বইটিতেও সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধারাবাহিকতা রয়েছে। বইটিতে কবিতাধর্মী গদ্য, বিভিন্ন বিষয়, ভিন্ন ভিন্ন পাঠরীতি এবং কারসনের তৈরি চিত্র একসঙ্গে এসেছে। বইটি তার ‘Float’-এর পর প্রথম মৌলিক রচনা হিসেবে প্রকাশিত হয় এবং ২০২৪ সালের ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল অ্যাওয়ার্ডে কবিতার জন্য পুরস্কৃতও হয়। (New Directions Publishing)

অপেরা, নাটক, সাহিত্য সমালোচনা এবং অন্যান্য শিল্পমাধ্যমেও কারসনের কাজের বিস্তার রয়েছে। ২০১৯ সালের ‘Norma Jeane Baker of Troy’ তার বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এতে ইউরিপিদিসের ‘Helen’ নাটকের ট্রয়ের হেলেনের কাহিনির সঙ্গে হলিউড তারকা মেরিলিন মনরোর জীবন ও চরিত্রকে এক সূত্রে যুক্ত করা হয়েছে।

দৃশ্যশিল্পী, নৃত্যপরিচালক, অপেরা ও নাট্য পরিচালকদের সঙ্গেও কারসন যৌথভাবে কাজ করেছেন। ফলে তার সাহিত্যকর্মে প্রচলিত жанর বা সাহিত্যিক কাঠামোর বাইরে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। ১৯৯০-এর দশক থেকে আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও শিল্পাঙ্গনে তার কাজের প্রভাবও এ কারণেই আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর নোবেল পাওয়ার দৌড়ে কারসনের নাম আগে থেকেই আলোচনায় ছিল। পুরস্কার ঘোষণার পর সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব ইনগ্রিড কার্লবার্গ জানান, কারসন পুরস্কারের খবর শুনে খুবই বিস্মিত হয়েছেন। ফোনে তার সঙ্গে কথা বলার সময় কারসন শুধু জানান, তিনি তখন আইসল্যান্ডে আছেন এবং বাতাসের শব্দ শুনছেন।

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, যা প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। আলফ্রেড নোবেলের উইল অনুযায়ী ১৯০১ সাল থেকে সাহিত্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ পুরস্কার দেওয়া হয়ে আসছে। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার এখন বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য সম্মানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।

তবে সাহিত্যে নোবেল নিয়ে বিতর্কও দীর্ঘদিনের। গত ১২০ বছরে লিও টলস্টয়, ভার্জিনিয়া উলফ ও হোর্হে লুইস বোর্হেসের মতো প্রভাবশালী সাহিত্যিকরা পুরস্কার না পাওয়ায় সুইডিশ একাডেমির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের লেখকদের উপেক্ষা করার অভিযোগও রয়েছে। যদিও ২০১৬ সালে মার্কিন সংগীতশিল্পী ও গীতিকার বব ডিলানকে সাহিত্যে নোবেল দেওয়া হয়েছিল।

পুরস্কারের সিদ্ধান্তের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের যুক্তি হলো, সুইডিশ একাডেমি অনেক সময় তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত সাহিত্যধারাকে বিশ্বের পাঠকের সামনে তুলে ধরেছে। ১৯৮২ সালে কলম্বিয়ার গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এবং ২০০৭ সালে ডরিস লেসিংয়ের পুরস্কারপ্রাপ্তিকে এর উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। তাদের মতে, নোবেলের অন্যতম লক্ষ্য হলো পাঠকদের নতুন সাহিত্যিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

এবার সেই নোবেলজয়ীদের তালিকায় অ্যান কারসনের নাম যুক্ত হলো, যেখানে রয়েছেন আলেকজান্ডার সলঝেনিৎসিন, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ও তার স্বদেশি অ্যালিস মানরোর মতো খ্যাতিমান সাহিত্যিকরা। ২০১৩ সালে অ্যালিস মানরো প্রথম কানাডিয়ান হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন। ২০২৫ সালে এ পুরস্কার পেয়েছিলেন হাঙ্গেরির লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। মার্কিন সাহিত্য সমালোচক সুসান সনট্যাগ তাকে ‘অ্যাপোক্যালিপসের মাস্টার’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে