দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা ও কারাবরণের স্মৃতি পেরিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি সীতাকুণ্ডের বিএনপি। দলের সাবেক কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক লায়ন আসলাম চৌধুরীকে ঘিরে উপজেলার ১২০টি ওয়ার্ডে মিষ্টি বিতরণের প্রস্তুতি চলছে-এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে। পাড়া-মহল্লা, হাটবাজার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক আড্ডা-সবখানেই আলোচনায় তাঁর নাম। সম্ভাব্য আনন্দ উদ্যাপন নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। তবে মিষ্টি বিতরণের আয়োজন, সময়সূচি কিংবা আয়োজকদের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
সীতাকুণ্ডের রাজনৈতিক অঙ্গনে আসলাম চৌধুরীকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, দলীয় অবস্থান এবং দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভূমিকার মূল্যায়ন নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক প্রতিকূল সময়ে মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হওয়া নেতাকর্মীদের ত্যাগ ও অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে সীতাকুণ্ডের বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ত্যাগের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত। স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, শিল্পাঞ্চল সীতাকুণ্ডে অসংখ্য নেতা-কর্মী রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েছেন। অনেক পরিবারের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার, কারাবরণ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিলেন বলে জানান তাঁরা।
বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঘিরে সীতাকুণ্ডের রাজনৈতিক আন্দোলন বিভিন্ন সময়ে জাতীয় পর্যায়েও আলোচনায় এসেছে। দেশের অর্থনীতি, বন্দর ও রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান লাইফলাইন এ মহাসড়ক। স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মহাসড়ক অবরোধের ঘটনায় রাজধানী ও বন্দরকেন্দ্রিক যোগাযোগ এবং পণ্য পরিবহনে প্রভাব পড়েছে। এসব আন্দোলনে আসলাম চৌধুরীর অনুসারীদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে দাবি স্থানীয় নেতাকর্মীদের। তাঁদের মতে, দীর্ঘ আন্দোলনে তৃণমূলের ত্যাগ ও সাংগঠনিক ভূমিকা দলীয় মূল্যায়নে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা. কমল কদর, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জহুরুল আলম জহুর, যুগ্ম আহ্বায়ক সালামত উল্লাহ, সদস্য সচিব মোহাম্মদ মোরসালিন ও যুগ্ম আহ্বায়ক ফজলুল করিম চৌধুরী ছাড়াও জাকির হোসেন, ছালে আহমদ ছলু, ইউসুফ নিজামী, মুজাহির উদ্দিন আশরাফ ও শহিদুল্লাহ ভূঁইয়াসহ স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা দলীয় কর্মকাণ্ডে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে পৌরসভা বিএনপির আহ্বায়ক জাকির হোসেন, সদস্য সচিব ছালে আহমদ সওদাগর ছলু, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মুজাহির উদ্দিন আশরাফ ও শহিদুল্লাহ ভূঁইয়াসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের ঘিরেও রয়েছে তৃণমূলের প্রত্যাশা। নেতাকর্মীদের মতে, পারস্পরিক সমন্বয়, নেতৃত্বের মধ্যে সহযোগিতা এবং সাংগঠনিক ঐক্য জোরদার হলে দলীয় কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
তবে সীতাকুণ্ডের মানুষের প্রত্যাশা শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা দলীয় কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এ উপজেলায় জাহাজভাঙা শিল্প, ইস্পাত কারখানা, অক্সিজেন কারখানা ও অন্যান্য ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি শ্রমিকের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, উন্নত কর্মপরিবেশ এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি দীর্ঘদিনের।
যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা প্রত্যাশা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট, দুর্ঘটনা ও ঝুঁকিপূর্ণ পারাপারে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও যাত্রীরা। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিতকরণ, নিরাপদ পারাপার, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দাবি তাঁদের।
স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নও স্থানীয় মানুষের অন্যতম প্রত্যাশা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক, সেবাকর্মী, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ওষুধের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রত্যন্ত ইউনিয়নের মানুষের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর দাবি রয়েছে।
পর্যটন সম্ভাবনায়ও সীতাকুণ্ডের রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি। চন্দ্রনাথ পাহাড়, গুলিয়াখালী ও বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত এবং খৈয়াছড়া ঝরনাকে ঘিরে বাড়ছে পর্যটকদের আগ্রহ। এসব পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তা, যাতায়াত, পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক, দিনমজুর ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নেও কার্যকর উদ্যোগ চান স্থানীয়রা।
সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের সমস্যা ও প্রয়োজন প্রতিফলিত হবে। শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক, পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা, উপকূলের জেলে, কৃষক, ব্যবসায়ী ও তরুণ প্রজন্মসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে।
সব মিলিয়ে ১২০ ওয়ার্ডে মিষ্টি বিতরণের গুঞ্জন ঘিরে সীতাকুণ্ডের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তবে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা শুধু আনন্দ উদ্যাপন নয়; অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগ স্বীকার করা নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন, রাজনৈতিক ঐক্য, সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা এবং এলাকার উন্নয়ন। তাঁদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক বিভেদ ও প্রতিহিংসার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হবে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জনকল্যাণের রাজনীতি।