সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে চলাচলকারী ৬২টি ফ্লাইট প্রভাবিত হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ৯ হাজার ৬৭৪ জন যাত্রী। পরিস্থিতি সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোকে সাতটি নির্দেশনা দিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। অন্যদিকে, ফ্লাইট বিপর্যয়ের কারণে সৌদি আরবে আটকে পড়া বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে কর্মস্থলে ফেরানোর জন্য দেশটির সঙ্গে আলোচনা চালানোর চেষ্টা করছে সরকার।
সোমবার (১২ অক্টোবর) রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় সৌদি আরবে সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইট পরিচালনাকারী সব উড়োজাহাজ সংস্থাকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। নির্দেশনায় যাত্রীদের ফ্লাইটের সর্বশেষ তথ্য জানানো, টিকিট পুনরায় বুকিং, অর্থ ফেরত এবং বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বেবিচক বলেছে, ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব কিংবা সময়সূচিতে পরিবর্তন হলে যাত্রীদের দ্রুত জানাতে হবে। এ জন্য মুঠোফোনে খুদে বার্তা, ফোনকল, ই-মেইল, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে হবে। নতুন যাত্রার সময়, পুনরায় টিকিট বুকিংয়ের পদ্ধতি, অর্থ ফেরত এবং বিকল্প ব্যবস্থার বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য দিতে হবে।
ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত না হয়ে যাত্রীদের বিমানবন্দরে না আসার পরামর্শ দিতে বলা হয়েছে। তবে যাঁরা ইতোমধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে গেছেন, তাঁদের কোনোভাবেই অসহায় অবস্থায় রাখা যাবে না। তাঁদের বসার জায়গা, পানীয় জল, নাশতা ও খাবারসহ প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে হবে। বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীর প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।
যাত্রীদের ভিসার মেয়াদ বা অভিবাসনসংক্রান্ত সহায়তার প্রয়োজন হলে সৌদি কর্তৃপক্ষ, ঢাকায় সৌদি দূতাবাস এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে পরামর্শ দিতে হবে। এ ছাড়া প্রতিটি উড়োজাহাজ সংস্থাকে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি নিয়োগ করে তাঁর যোগাযোগের তথ্য বিমানবন্দরের ফ্লাইট ব্যবস্থাপনা বিভাগে জমা দিতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ওই প্রতিনিধিকে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় রাখতে হবে।
বেবিচকের হিসাবে, প্রভাবিত সরাসরি ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ৯টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ২টি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের ৫টি এবং রিয়াদ এয়ারের ৭টি রয়েছে। এ ছাড়া ইন্ডিগো, এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, ফ্লাইদুবাই, সালাম এয়ার ও ইজিপ্ট এয়ারের ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইটও প্রভাবিত হয়েছে। তবে এই হিসাব তৈরির সময় রিয়াদ এয়ারের যাত্রীদের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল না বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে, ফ্লাইট বিপর্যয়ের কারণে সৌদি আরবে আটকে পড়া বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে কর্মস্থলে ফেরানোর বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার চেষ্টা করছে সরকার। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) একটি অনুষ্ঠানের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নূর।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেসব কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার কাছাকাছি, তাঁদের মেয়াদ বাড়িয়ে কর্মস্থলে ফেরানোর বিষয়ে সৌদি আরবসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এর আগে ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে কর্মীদের কর্মস্থলে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
নুরুল হক নূর বলেন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সাধারণত এ ধরনের বিষয়ে সহযোগিতাপ্রবণ থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরবও সংকটের মধ্যে রয়েছে। তারপরও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রিয়াদে সাম্প্রতিক হামলায় বাংলাদেশি নাগরিকদের হতাহত হওয়ার ঘটনায় সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিদের খোঁজখবর নিয়েছেন। আহতদের চিকিৎসা এবং নিহতদের মরদেহ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রেও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সহযোগিতা করছে।
প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জানান, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মাধ্যমে নিবন্ধিত কোনো কর্মী বিদেশে মারা গেলে সরকারিভাবে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী কোনো কোনো কোম্পানিও কর্মীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে থাকে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বিদেশগামী শ্রমশক্তির প্রায় ৭৫ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যান। তাঁদের অর্ধেকের বেশি সৌদি আরবমুখী। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে কয়েক মাস বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা কমলেও তা আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে বলে জানান তিনি।
যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আশা প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সংঘাত শেষ হলে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের পুনর্গঠনকাজে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এসব কাজে বাংলাদেশি কর্মীরা অগ্রাধিকার পাবেন বলে সরকার আশা করছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার উদ্যোগও চলছে।
দেশে ফিরে আসা কর্মীদের পুনর্বাসনের বিষয়ে তিনি জানান, পুনরেকত্রীকরণ প্রকল্পের আওতায় তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পূর্ব অভিজ্ঞতার সনদ মূল্যায়নের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ায় সরকারিভাবে অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই কর্মী পাঠানো এবং সরকার-টু-সরকার প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়েও কাজ চলছে।
ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের সংশ্লিষ্ট উড়োজাহাজ সংস্থার কাছ থেকে যাত্রার সর্বশেষ তথ্য নিশ্চিত করে বিমানবন্দরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাঁদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।