বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত সংস্থা। এই প্রতিবেদনে মোট ৩০ জনের হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, দিনটি পেরোনোর আগেই আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি রয়েছে প্রসিকিউশনের।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার দাবিতে চলমান ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ চলাকালে রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ। তার মৃত্যুর পর সারা দেশে ছাত্র ও নাগরিকদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন আরও তীব্র হয়, বাড়তে থাকে হতাহতের সংখ্যা। আবু সাঈদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংগঠিত এই আন্দোলনকে সরকার ও নাগরিক সমাজ ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত করে।
এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে ২ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলাটি দায়ের হয়। এরপর ১৫ জুন আদালত এক আদেশে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে ১৪ জুলাই পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়সীমার আগেই তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে জমা দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে সরাসরি জড়িত হিসেবে নাম উঠে এসেছে চারজনের:
১. সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এসআই) আমির হোসেন
২. কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়
৩. বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম
৪. ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী আকাশ
এই চারজন এরই মধ্যে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, এই চারজন সরাসরি গুলি চালানো, নির্দেশ দেওয়া এবং সহায়তা করার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও দলীয় ক্যাডারসহ আরও অনেককে সহায়তা ও উসকানিদাতা হিসেবে তদন্ত প্রতিবেদনে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন, বি এম সুলতান মাহমুদ এবং এস এম মঈনুল করিম। তারা আদালতকে জানান, হত্যার ঘটনায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণ কাজে লাগানো হয়েছে।
তারা আরও জানান, আবু সাঈদকে হত্যার পরপরই আন্দোলন দেশজুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের প্রথম শহীদ হিসেবে সরকার ১৬ জুলাই দিনটিকে ‘শহীদ আবু সাঈদ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার-এর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই মামলার শুনানি গ্রহণ করেন। অভিযুক্তদের মধ্যে চারজন আদালতে উপস্থিত থাকলেও বাকিদের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে গ্রেপ্তার ও বিচার কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রসিকিউশন।
মামলায় আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী রাশেদুল হক খোকন ও দেলোয়ার হোসেন সোহেল। তারা তদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগপত্রের অনুলিপি দেখে পরবর্তী শুনানিতে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করবেন বলে জানিয়েছেন।