রাজশাহীর পদ্মা চরে এক রাতে দু’শ গরু-মহিষকে ভারতীয় শেয়ালের আক্রমণ

এফএনএস (এস.এইচ.এম তরিকুল ইসলাম; রাজশাহী) : | প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৭:২১ পিএম
রাজশাহীর পদ্মা চরে এক রাতে দু’শ গরু-মহিষকে ভারতীয় শেয়ালের আক্রমণ

রাজশাহীর চরে এক রাতে ভারত থেকে দলবেধে আসা শেয়ালের আক্রমণে দুইশ’ গরু-মহিষ আহত হয়েছে। এ ঘটনায় খামারিদের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক নেমে এসেছে। আক্রান্ত বেশ কিছু পশুর কান ছিঁড়েও নিয়েছে এবং বাকি গরু-মহিষের মুখসহ শরীরের অনেক স্থানে কামড়ে জখম করেছে শেয়ালের দল। আর আক্রান্ত গরু-মহিষগুলো কোনোভাবেই বিক্রি করা না হয়, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত ২১ ডিসেম্বর ভোর রাতে রাজশাহীর পবা উপজেলাধীন পদ্মার দুর্গম মাঝচর এলাকায় এ ঘটনাটি ঘটে।

এর আগে এতো গরু-মহিষকে একসঙ্গে কখনোই শেয়াল কামড়ায়নি দাবি করে খামারিরা জানান, এটি এক বিষ্ময়কর ঘটনা। খবর পেয়ে পরের দিন ২২ ডিসেম্বর দুপুরেই আক্রান্ত গরু-মহিষগুলোকে র‌্যাবিজ ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো আতঙ্ক কাটেনি খামারিদের। গরু বাঁচাতে এখন রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন খামারিরা। পাশাপাশি আক্রান্ত গরু-মহিষগুলোকে যেন কোনোভাবেই বিক্রি করা না হয়, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, মাঝ চরের বাসিন্দারা অধিকাংশই গরু-মহিষের খামারি। একেকজনের ৫ থেকে শতাধিক গরু-মহিষও আছে। তারা কয়েকজন মিলে দলবেধে গরু-মহিষগুলো চরে চড়ান। সেগুলো চরেই রাতে পাল করে একসঙ্গে চারিদেক বাঁশ অথবা খড়ের বেড়া দিয়ে ঘিরে রেখে বাসায় চলে আসেন। আবার ভোরে গিয়ে সেগুলো বের করে চরের মধ্যে চড়ায় থাকেন। এভাবেই চরের খামারিরা বছরের পর বছর ধরে চরে গরু-মহিষ পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু ২১ ডিসেম্বর ভোরে কয়েকজন রাখাল চরে রেখে আসা পালের গরু-মহিষের কাছে গিয়ে বিস্মিত হোন। এরপর খামারিরা বিষয়টি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ওয়ার্ড সদস্য আবু জাফর ইবনে আলম প্রমিজকে জানান। 

এ ঘটনায় ইউপি সদস্য আবু জাফর ইবনে আলম প্রমিজ বলেন, খবরটি পাওয়া মাত্রই স্থানীয় উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে জানালে তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আক্রান্ত গরু-মহিষগুলোকে র‌্যাবিজ ভ্যাকসিন প্রয়োগের ব্যবস্থা করেন। একে একে আক্রান্ত ২০০ গরু-মহিষকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়ছে। শেয়ালের কামড়ে আক্রান্ত গরু-মহিষগুলোর মাঝে যেন জলাতঙ্ক রোগ ছড়াতে না পারে, সে জন্য পর্যায়ক্রমে আরও চারটি ডোজ দেওয়া হবে।

চরের খামারি মাহাবুবুল শেখ বলেন, আমার ৪০টি গরু-মহিষ আছে। আরও কয়েকজনের মিলে একসঙ্গে ৬০০ গরু-মহিষ একপালেই রাখা ছিল। কিন্তু ভোরে গিয়ে দেখি অনেকগুলো গরু-মহিষকে কামড়ায়ছে শেয়াল। পাশের আরও একটি পালেও একই অবস্থা। সবমিলিয়ে অন্তত ২০০ গরু-মহিষকে কামড়াইছে শেয়াল। এর আগে কখনো এতোগুলো গরু-মহিষকে একসঙ্গে কামড়ানোর কোনো ঘটনা ঘটেনি। ফলে আমাদেও মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। আমরা গরু-মহিষ রাত জেগে পাহারা দিচ্ছি।

অপর খামারি ঝাটু শেখ বলেন, আমি প্রায় ৪০ বছর ধরে গরু-মহিষ পালন করছি। কখনো মহিষকে শেয়ালে আক্রমণ করেছে এমন ঘটনা ঘটেনি। কারণ মহিষ দেখলে শেয়াল ভয় পাই। এই প্রথম মহিষকেও কামড়াইছে শেয়াল। এটি নজিরবিহীন।

স্থানীয় কাজিম আলী নামের খামারি জানান, মাঝ চরের অদুরেই রয়েছে ভারতের ষাটবিঘা চর। ওই চরে সাধারণত কেউ যায় না। দুর্গম ওই চরে বাংলাদেশী বা ভারতীয় কেউ যান। ফলে ওই চরে প্রায় হাজার কয়েক হাজার বন শুকুর আর কয়েক হাজার শেয়াল বসবাস করে। ঘটনার আগেরদিন গোদাগাড়ীর কয়েকজন আদিবাসী (সাওতাল) মাঝ চরের পাশেই ভারতের সেই ষাটবিঘা চরে গিয়েছিলেন শেয়াল ও শুকুর শিকার করতে। তারা কয়েকটি শুকুর আর শেয়ালের বাচ্চা শিকার করে নিয়ে গেছেছিলেন ওইদিন। এরপর ওইদিন রাতেই শেয়ালগুলো ক্ষুব্ধ হয়ে বাংলাদেশের চরে ঢুকে গরু-মহিষের পালে আক্রমণ করে। তবে এই ধরনের ঘটনা অতিতে কখনো ঘটেনি বলেও দাবি করেন কাজিম আলী।

এ ঘটনায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার মো. আব্দুল লতিফ বলেন, ঘটনাটি শুনে প্রথমে অবাকই হয়েছিলাম। একসঙ্গে এতোগুলো গরু-মহিষকে বিশেষ করে মহিষকে তো শেয়ালে কামড়ায় না। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে তার সত্যতা দেখে দ্রুত র‌্যাবিজ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়। ভ্যাকসিন দেয়ার সময় দু’জন চরবাসীকেও শেয়াল কামড় দিতে দেখা যায় দিনে-দুপুরে। তাতে বুঝা যায় আক্রমণকারী শেয়ালগুলো ক্ষুব্ধ ছিলো। শতাধিক শেয়াল গরু-মহিষের পালের অদূরেই অবস্থান করছিল। এটি বিষ্ময়কর।

তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে তিনটি কারণে এতোগগুলো গরু-মহিষকে এক রাতেই আক্রমণ করার লক্ষণ খুঁজে পেয়েছি। এই কারণগুলো, শেয়ালের কয়েকটি বাচ্চা শিকার করা, খাদ্যশৃঙ্খল নষ্ট হওয়া অথবা দুই-চারটি শেয়াল পাগলা হয়ে যাওয়া। যাদের সঙ্গে অন্যান্য শেয়ালও এসে গরু-মহিষগুলোকে আক্রমণ করেছে। তবে দলবেধে আক্রমণ করার কারণে মহিষও তাদের হাত থেকে রক্ষা পাইনি।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আক্রান্ত গরু-মহিষগুলো সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত যেন কেউ বিক্রি করতে না পারে, সেজন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি নরজদারিতে রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যেই পশুগুলো সুস্থ করার লক্ষ্যে ভ্যাকসিনের ১ম ডোজ প্রয়োগ করা হয়েছে। বাকি চার ডোজও নিয়মমতো দেওয়া হবে। এরপর পশুদের শারীরিক পরীক্ষা-নিরিক্ষা শেষে বাজারজাত করার অনুমতি দেওয়া হবে। তখন মানবদেহে কোন ভাইরাস ছড়ানোর শঙ্কা থাকবেনা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে