শৈত্যপ্রবাহের হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত জনজীবন

এফএনএস (রিনা হায়াত; কলমাকান্দা; নেত্রকোনা) : | প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০১:১৬ পিএম
শৈত্যপ্রবাহের হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত জনজীবন

প্রচন্ড শীত। সীমান্তবর্তী মেঘালয় পাদদেশ ঘিরে কলমাকান্দা উপজেলাতে বেড়েছে শীতের তীব্রতা। হিমেল বাতাসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এখানকার জনজীবন। চলতি মৌসুমে এই জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৭ দশমিক ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। সীমান্তবর্তী অঞ্চল হিসাবে এখানে ১১-১২ টার আগে কোন সূর্যের দেখা মিলেনা। এখানকার আবহাওয়া এতই কুয়াশাছন্ন যে, ভোরে ঘন কুয়াশায় চারপাশ ঢেকে যাওয়ায় এখানকার সড়কগুলিতে যানবাহনগুলি বিভিন্ন সিগনাল লাইট জ্বালিয়ে যান চলাচল করছে। প্রচন্ড শীতের এই তীব্রতায় সবচেয়ে বেশী দুর্ভোগে পড়েছে নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষগুলি। শীতের কুয়াশা ও ঠান্ডা উপেক্ষা করেই জীবিকার তাগিদে অতি ভোরে ঘর ছাড়তে হচ্ছে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষদের। এখানকার আবহাওয়া বার্তা জানায়, সামনে আরও শীত পড়বে এই পাহাড়ি অঞ্চলে। গত কয়েকদিন ধরে এখানকার বাতাসের আর্দ্রতা হিম শীতল। এখানকার পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষেরা খঁড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের সাময়িক দৃশ্য দেখা যায় বিভিন্ন বাড়ি আঙ্গিনা উঠোনে।

পৌষের শেষে আর মাঘের আগমনে প্রকৃতিতে এখন দাপুটে শীত। উত্তরবঙ্গ ছাড়িয়ে শৈত্যপ্রবাহের হিমেল হাওয়ার প্রচন্ড ঠান্ডারচাঁদর ও ঘন কুয়াশার আচ্ছাদনে ঘেরা মৃদু আলো আঁধার আর সূর্য্যরে লুকোচুরি এখন সম্প্রতি দেশের সবচেয়ে শীত ও গরম আবহাওয়া প্রবণ এলাকায় পরিনত হওয়া অঞ্চল হিসাবে মেঘালয়ার এই পাদদেশ কলমাকান্দা উপজেলা।

ভোরের ঘন কুয়াশার চাঁদর ভেদ করে যখন সূর্যের দেখা মেলে, ততক্ষণে জনজীবনে নেমে আসে স্থবিরতা। তবে এই হাড়কাঁপানো শীতের মাঝেও বাংলার জনপদে উঁকি দিচ্ছে হাজার বছরের ঐতিহ্য-গাছিদের গাছ ছাঁটা, মাটির কলসিতে ফোঁটায় ফোঁটায় জমা হওয়া টাটকা খেঁজুরের রস আর ঘরে ঘরে পিঠা-পুলির উৎসব। শীতের বিপরীত দিকে তাকালেই দেখা যায়, মুদ্রার উল্টো পিঠের নির্মম বাস্তবতায় নিম্নবৃত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের বেঁচে থাকার তীব্র লড়াইয়ের হাড় কাঁপুনি ঠান্ডার করুন রূপ!

বাঙালির ঐতিহ্য খেঁজুর রস ও পিঠার ঘ্রাণ:- গ্রাম বাংলার শীত মানেই ভোরের আলো ফোঁটার আগে গাছিদের কাঁধে রসভর্তি মাটির কলসি। কনকনে ঠান্ডার মাঝেও মাটির উনুনে তৈরি ধোঁয়া ওঠা ভাঁপা, চিতই কিংবা দুধ-পুলি পিঠার স্বাদ বাঙ্গালির ডিএনএ-তে মিশে আছে। নতুন গুড়ের মৌ মৌ গন্ধে মুখরিত হয় বাড়ির আঙ্গিনা। কুয়াশার চাঁদরে ঢাকা সকালে মুড়ি আর টাটকা খেঁজুরের রস-এ যেন এক আদিম প্রশান্তি। এই ঐতিহ্য কেবল রসনাবিলাস নয়, বরং আমাদের শিকড়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বর্তমান উত্তরবঙ্গের হাড়কাঁপানো শৈত্যপ্রবাহ পরিস্থিতি বিরাজমান:- গত কয়েকদিন ধরে দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, তাপমাত্রা অনেক স্থানেই ৮ক্কঈ থেকে ১০ক্কঈ-এর নিচে নেমে এসেছে। হিমালয় থেকে আসা উত্তরীয় হাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত। বিশেষ করে নদী অববাহিকার চরাঞ্চলগুলোতে কুয়াশার দাপটে দিনের বেলাতেও হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করতে হচ্ছে।

জীবন যেখানে শীতের কঠিন বাস্তবতায় নিম্নবিত্তের ঘরে শীত নিবারণে হাহাকার:- শীতের এই সৌন্দর্য সবার জন্য আনন্দদায়ক নয়। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের শ্রমজীবী এবং দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে শীত এক বিভীষিকার নাম।

পোশাকের স্বল্পতা:- এক টুকরো গরম কাপড়ের অভাবে অনেক পরিবার খঁড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছে সকাল ও সন্ধ্যায় শীতের তীব্রতা কিছুটা নিবারনের জন্য।

নিম্নবৃত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার গুলোর শীতের সঙ্গে লড়াই:- আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্যের বাজারে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর কাছে নতুন সোয়েটার বা কম্বল কেনা এখন বিলাসিতা। গ্রাম্য হাট বাজার ও শহরের ফুটপথের ধারে অল্প দামের পুরনো কাপড়ের দোকান গুলোতে উপচে পড়া ভিড়ই বলে দিচ্ছে মানুষের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার গোপন অবস্থার কথা।

করুণ চিত্র:- কুয়াশাভেজা সকালে পাতলা সুতি চাদর গায়ে দিয়ে ভ্যান চালানো চালক কিংবা ফুটপাতের ধারে পাতলা সুতিকাপড় মুড়িয়ে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর হাড়কাঁপানো থরথরানি এক নিদারুণ বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে।

কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব:- তীব্র শীত ও কুয়াশায় বোরো ধানের বীজতলা এবং রবি শস্যের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে শীতজনিত রোগ-নিউমোনিয়া, জ্বর সহ সর্দি কাশি, অ্যাজমা-হাঁপানি- শ্বাসকষ্ট এবং ডায়রিয়ার প্রকোপ। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়।

বাস্তব চিত্রে শীতের সকাল যেমন আমাদের ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়, তেমনি সমাজের বিশাল এক অংশের অসহায়ত্বের চিত্রও আমাদের সামনে উন্মোচিত করে। একদিকে খেজুরের রস-গুড়ের মিষ্টি স্বাদ, অন্যদিকে কনকনে ঠান্ডায় এক চিলতে উষ্ণতার জন্য হাহাকার-এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই বাংলাদেশের বর্তমান শীতকাল। এই পরিস্থিতিতে সরকারের পাশাপাশি বিত্তবান ও মানবিক সংস্থাগুলোর উচিত শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, যাতে শীতের সকাল কেবল যন্ত্রণার নয়, বরং সবার জন্য আরামদায়ক এবং ঋতুর বৈচিত্রে শীত হয়ে উঠুক সবার জীবনে উৎসবের ইমেজ ও আবহমান বাংলার চিরচারিত প্রাকৃতিক স্নিগ্ধতার রুপ।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে