হারিয়ে গেছে সরাইল বাজারের ঐতিহ্য

এফএনএস (মাহবুব খান বাবুল; সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া) : | প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৭:০১ পিএম
হারিয়ে গেছে সরাইল বাজারের ঐতিহ্য

 ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল সদরের বিকাল বাজার হারিয়ে ফেলেছে তার ঐতিহ্য। লাপাত্তা হয়ে গেছে আগের শৃঙ্খলা। ক্রেতার রাস্তা ও ফুটপাত দখলে নিয়েছেন বিক্রেতারা। ফলে জ্যাম ও যানজটের দুর্ভোগ নিত্যদিনের সাথী। সেখানে যেখানে ময়লা ফেলায় বাজারে নেই পরিচ্ছন্নতা। হাটবারে এখন নেই আগের থমথমি। নেই কোন হাকডাক। কমে গেছে ক্রেতা বিক্রেতার উপস্থিতি। আগের মত হরেক রকমের আকর্ষণীয় পণ্য সামগ্রীরও দেখা মিলে না। ফলে ক্রয় বিক্রয়ও হতাশাজনক। ক্রেতাদের হাঁটা চলার রাস্তা দখলে নিয়েছেন ব্যবসায়িরা। মালামালে ক্রেতার পা বা শরীরের ঘষা লাগলেই বাঁধে ঝামেলা। অনেক সময় ছোট বিষয়টি দাঙ্গায় রূপ নেয়। ঘটে হতাহত ও পঙ্গুত্ব বরণের মত ঘটনা। কমিটির পরামর্শ আমলে না নেয়ার অভিযোগ আছে ব্যবসায়িদের বিরূদ্ধে। 

সরেজমিন অনুসন্ধান, ক্রেতা-বিক্রেতা ও কমিটির সদস্য সূত্র জানায়, কয়েকশত বছরের পুরাতন এই বাজারটির ছিল অনেক ইতিহাস ও ঐতিহ্য। ভোর থেকে রাত ১০-১১ টা পর্যন্ত এই বাজারে ক্রেতা বিক্রেতার আনাগোনা থাকতো। তরকারি, মাছ, মাংশ, শুটকি, পান, মসলা, কলা, কবুতর-হাঁস-মোরগ, মাছ ধরার জাল, পাটি-ধারি-ওড়া-কোদাল, চিড়া-মুড়ি-গুড়, ডিম, নতুন/পুরাতন কাপড় ও মুদি মনোহারী দোকান ছিল আলাদা। বাজারটি ছিল পরিচ্ছন্ন। কমিটির নির্দেশ সকল ব্যবসায়ি মেনে চলতো। তাই শৃঙ্খলা ছিল চমৎকার। দোকান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত স্থানের বাহিরে কেউ কোন মালামাল রাখতেন না। ক্রেতারা ইচ্ছেমত ঘুরে ফিরে দেখে শুনে পছন্দের পসরা ক্রয় করতো। ভারী মালামাল নিতে ক্রেতারা রিকশা ভ্যান গাড়ি নিয়ে বাজারে প্রবেশ করতেন অনায়াশে। সকাল বেলা বাজারে প্রবেশ করলেই ধুপ আর আগরবাতির সুগ্রাণে মন ভরে যেত। ভোর থেকে প্রতিদিন রাত ১০-১১টা পর্যন্ত বাজারের অধিকাংশ দোকানপাটই খোলা থাকত। ফলে রাতে বাজার সদাই করতেও কোন সমস্যা হতো না। উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়নের পাইকারী ও খুচরা ক্রেতারা ছুটে আসতে এই বাজারে। বিশেষ করে সপ্তাহের সোমবার ও শুক্রবার দুইদিন হচ্ছে সরাইলের হাটবার। হাটবারে সকাল থেকেই বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে ক্রেতা বিক্রেতারা ছুটে আসতেন বাজারে। বেলা বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তো মানুষের উপস্থিতি। দুপুরের পর পুরো বাজারের কোথাও তিল ধারণের জায়গা থাকতো না। অনেক সময় বাবা চাচা ভাইয়ের সাথে আসা বাচ্চারা হারিয়ে যেত। ফলে বাজারের মাইকে হারোনো বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হতো। আগত মানুষজনের ঘমঘম শব্দে সরাইলের রাস্তা ঘাট বাজারে কান ধরা যেত না। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া শান্তশিষ্ট্য ভাবে বাজারের কাজ শেষ করে মানুষজন বাড়ি ফিরত। হাজারো ঐতিহ্যের ধারক-বাহক ছিল সরাইল বিকাল বাজারটি। কালের আবর্তে আজ বাজারটি তার সকল ঐতিহ্যই হারিয়ে ফেলেছে। যদিও কয়েক বছর আগে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাজারের পুরাতন ঝরাজীর্ণ ঘর গুলো সরিয়ে অত্যাধুনিক ৮টি টিনশেড ভবন নির্মিত হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে ল্যাট্রিন। পানি নিস্কাশনের জন্য ড্রেন করা হয়েছে। ওই সময়ে বাজারের দোকান বা ব্যবসার স্থান বরাদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নিয়ম না থাকলেও অনেকেই কৌশলে তদবির করে শেডের জায়গা বাগিয়ে নিয়েছেন। তাদের অনেকেই ব্যবসা করছেন না। মাসিক ৫/৬ হাজার টাকায় অন্যের কাছে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যবসায়ি বলেন, দোকান নেয়ার সময় সাড়ে তিন-৪ হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে। শেড গুলির মাঝখানের খালি জায়গা গুলো মুলত ক্রেতাদের স্বাচ্ছন্দে চলাফেরার জন্য রাখা হয়েছিল। সেই জায়গা গুলোও মাসিক সাড়ে তিন/চার হাজার টাকায় ভাড়া দেয়া হয়ে গেছে। এরপরও মুদিসহ সকল ব্যবসায়ি তাদের মালামাল দোকানের বাহিরে (৩-৪ ফুট) ক্রেতাদের চলার রাস্তায় সাজিয়ে বসছেন প্রতিদিন। কিছু জায়গায় ক্রেতার রাস্তাকে বানিয়ে রেখেছেন মালের গোডাউন। ফলে বাজারে চলাফেরায় অস্বস্থি বোধ করছেন ক্রেতারা। রাস্তার উপর দোকানপাট সম্প্রসারণ করতে পর্দা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। এজন্য অধিক বা ভারী মালামাল বহনে ক্রেতারা দূর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বাজারে আসা মহিলা ক্রেতাদের চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। এ ছাড়া ব্যবসায়িরা ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলে বাজারের পরিবেশ অপরিচ্ছন্ন করছেন নিত্যদিন। হাসপাতালের মোড় থেকে সকাল বেপারীপাড়া ব্রীজ পর্যন্ত রাস্তার উপর ও ফুটপাট দখলে নিয়ে রেখেছেন ব্যবসায়িরা। কিছু ব্যবসায়ি মাসিক ভাড়ার গোপন চুক্তিতে নিজের দোকানের সামনে সড়কে বসে খুচরা ব্যবসা করার সুযোগ দিয়ে রেখেছেন। গোটা  বিকাল বাজার এলাকায় একই চিত্র। ক্রেতা রমিছা বেগম, রোজিনা আক্তার, আজিজ মিয়া ও জোতিষ চৌধুরী বলেন, সরাইল বিকাল বাজারে দখলের কারণে হাঁটার জায়গা খুবই সরূ। পণ্য পরিবহন করতে হিমশিম খেতে হয়। মহিলারা তো একবার আসলে দ্বিতীয়বার দ্বিধাবোধ করেন। রাস্তার মালে ক্রেতার পা লাগলে উত্তেজিত হয়ে যান অনেক বিক্রেতা। উভয়ের বাক-বিতন্ডা এক সময় সংঘর্ষের রূপ নেয়। গত কিছু দিন আগে অন্নদা স্কুল মোড়ে ফলের দোকানের ফলের হাড়িতে পথচারীর পা লাগায়। দোকানী ক্ষেপে যান। বাক-বিতন্ডা ও হাতাহাতি হয়। এর জেরে দুই গ্রামের লোকজন দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দীর্ঘ ৬ ঘন্টা লড়াই করেন। আহত হন অর্ধশতাধিক নারী পুরূষ। বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ভাংচুর হয়। এভাবে একটা বাজার চলতে পারে না।  এসব বিষয়ে ব্যবসায়িরা কমিটির কোন পরামর্শ বা নির্দেশ আমলেই নিচ্ছেন না। আর এভাবেই হারিয়ে গেছে বাজারের শৃঙ্খলাও। ফলে আস্তে আস্তে ওয়ার্ড, গ্রাম ও ইউনিয়নের ক্রেতা-বিক্রেতারা নানা কারণে হয়ে গেছেন বাজার বিমুখ। গত ৩-৪ বছর ধরে বাজারে ক্রেতা বিক্রেতার শুধু কমেই আসছে। মূল বাজারটি যেন তার যৌবন হারিয়ে ফেলছেন। বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি মাওলানা মো. কুতুব উদ্দিন বিক্রেতা কর্তৃক ক্রেতার জায়গা সড়ক ও ফুটপাত দখলের কথা স্বীকার করে বলেন, আমরা নিজ হাতে দোকানের বাহিরের মালামাল ভেতরে দিয়েছি একাধিকবার। কিছুক্ষণ পরই আবার বাহিরে। শত চেষ্টা করেও দোকানীদের সাথে পারছি না। দেখি আবার চেষ্টা করছি।   

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে