বর্তমান সময়ে নানা কারণে আলোচিত এক আসনের নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ-বিজয়নগরের একাংশ)। আর সেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছেন বিএনপি’র সাবেক মহিলা এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও গুরূত্বপূর্ণ টকশো ব্যক্তিত্ব ব্যারিষ্টার রূমিন ফারহানা। কারণ বিএনপি’র অন্যতম শরিক জমিয়তে ওলামা ইসলামের প্রার্থীকে আসনটি ছেড়ে দেওয়ার পরও সেখানে শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন রূমিন ফারহানা। দলের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণাকে উপেক্ষা করেই রূমিন ফারহানা ধানের শীষের ওই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন। সাথে রয়েছেন ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের বিভিন্ন কমিটির নেতৃবৃন্দ। শুক্রবার সন্ধ্যায় গ্রামের বাড়ি বিজয়নগর উপজেলা বুধন্তি ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে দাদা, দাদিসহ স্বজনদের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে সংসদ নির্বাচনের কার্যক্রম শুরূ করেছেন। সবশেষে প্রয়াত পিতা অলি আহাদের পথেই হাঁটতে শুরূ করেছেন রূমিন ফারহানা। উনার পিতাও ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সংসদ নির্বাচন করেছিলেন। ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের আগামী নির্বাচনে তিনিও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন। তাই নির্বাচনী এলাকার অনেক প্রবীণ ব্যক্তিরা বলছেন, ‘বাপের পথেই হাঁটছেন বেটি।’
দলীয় সমর্থক ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, এক সময় বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক লীগের নেতা ছিলেন রূমিন ফারহানার পিতা অলি আহাদ। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ‘গাভী’ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন। তিনি প্রতিদ্বন্ধিতা করেছিলেন প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা তাহের উদ্দিন ঠাকুরের (নৌকা) সাথে। রূমিন ফারহানার দাবী ওই নির্বাচনে অলি আহাদ প্রায় ৪০ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। আর তাহের উদ্দিন ঠাকুর পেয়েছিলেন ২৮ হাজার ভোট। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান তথা আওয়ামী লীগ তখন ওই ফলাফলকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। কৌশলে শেখ মুজিব তখন ফলাফলটা স্থানীয়ভাবে ঘোষণা না দিয়ে ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন। পরের দিন ঢাকা থেকে ফলাফল উল্টিয়ে তাহের উদ্দিনকে ৪০ হাজার ভোট দেখিয়ে জয়ী ঘোষণা করা হয়। আর ২৮ হাজার ভোট দেখিয়ে অলি আহাদকে নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ অলি আহাদের প্রাপ্ত ভোট ছিনিয়ে নিয়ে জনসাধারণের সাথে প্রতারণা করে পরাজিত করা হয়েছে। সেই ভাষা সৈনিক অলি আহাদের স্বপ্নকে গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কবর দেওয়া হয়েছিল। পিতার সেই দু:খ ব্যাথা ও বেদনার ইতিহাস পরবর্তী সময়ে রূমিন ফারহানা জানেন। কষ্টের সেই ইতিহাস বুকে ধারণ করেই রাজনীতির মাঠে হাটি হাটি পা পা করে চলছিলেন রূমিন। অনেক চড়াই উৎড়াই ও নানা প্রতিকুলতা ফেইস করে বিএনপিতে রূমিন ফারহানা একটি অবস্থান করে নেন। নিজের মেধা যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা দ্বারা বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদকের পদ পান তিনি। দলের জন্য মাঠে ময়দানে রাজপথে ও টিভি টকশোতে গুরূত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। সরকারের দমন পীড়ন জুলুম নির্যাতন সহ্য করেও দলের জন্য থামেনি উনার লড়াই সংগ্রাম। তিনি একা আওয়ামী লীগের ৩ শতাধিক এমপি’র সাথে জাতীয় সংসদে লড়াই করে কাঁপিয়ে তুলেন। সংসদে দাঁড়িয়ে ওই সময়ের সরকারকে অবৈধ দাবী করেন একাধিকবার। সমগ্র দেশে বিএনপি ও এর সহযোগি অঙ্গসংগঠনের নেতা কর্মীদের অবৈধ গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ করেন। তাদের জামিনের জন্য আদালতেও লড়াই চালিয়ে যান। আর এভাবেই এক সময় রূমিন ফারহানা সমগ্র দেশের মানুষের মনে জায়গা করে নেন। রূমিন ফারহানা পিতার ও নিজের জন্মভূমির মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। স্বপ্ন দেখছিলেন এমপি নির্বাচিত হয়ে নিজের এলাকায় প্রয়াত পিতার ইচ্ছে গুলো পূরণ করার। সেই লক্ষ্যে গত দেড় যুগ আগ থেকেই তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে কাজ শুরূ করেন। বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরূ করে নির্বাচনী এলাকার মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে থাকেন। নিয়মিত ভাবে দলীয় কর্মসূচি সভা সেমিনার উঠান বৈঠক ও গণসংযোগ করতে থাকেন। নির্বাচনী এলাকার নারী পুরূষের কাছে হয়ে উঠেন প্রিয়ভাজন। ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই আগষ্টের পর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিতার জয়লাভ ছিনিয়ে নেওয়া আসনে নির্বাচন করে জয়লাভের মাধ্যমে রেকর্ডটি পূর্ণ উদ্ধারের স্বপ্ন দেখেন রূমিন। এক যুগেরও অধিক সময় চষে বেড়ানো ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের ঘোষণা দিতে থাকেন। দলীয় নেতা কর্মী ও রূমিন ফারহানা খুবই আশাবাদী ছিলেন দল এই আসনে উনাকেই মনোনিত করবেন। কিন্তু জোটের সাথে আসন ভাগাভাগিতে গণেশ উল্টে গেল ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের। শতভাগ নিশ্চিত ধানের শীষের এই আসনে জোটের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি চারিদিকে চাউর হতে লাগল। মন ভেঙ্গে চুপসে গেলেন স্থানীয় বিএনপি ও দলটির অঙ্গ সহযোগি সংগঠনের নেতা কর্মীরা। মন খারাপ করেননি রূমিন ফারহানা। তিনি বলতে থাকেন জনগণের ইচ্ছার বাস্তবায়ন করতে এই আসনে আমি নির্বাচন করবই। উনার এমন সব ইশারা ইঙ্গিতেই সমর্থকরা বুঝেছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার দিকে এগুচ্ছেন তিনি। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় বিএনপি জমিয়তের মাওলানা জুনাঈদ আল হাবিবকে এই আসনে তাদের জোটের প্রার্থী ঘোষণা দেন। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি তিনি। উনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার অষ্টগ্রাম ইউনিয়নের অষ্টগ্রামের বাসিন্দা। সোমবার তাঁর পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। উনার প্রতীক খেজুরগাছ। এরপর বুধবার রূমিন ফারহানার পক্ষে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবুবকর সরকারের কাছ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন উপজেলা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আলী হোসেন। রূমিন ফারহানা মানবজমিনকে বলেন, ‘গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দাদা দাদিসহ স্বজনদের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে বৃহস্পতিবার থেকে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরূ করেছি। গত ১৭টি বছর মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই করেছি। অনিয়ম অন্যায় অবিচার ও দূর্নীতির বিরূদ্ধে সংগ্রাম করেছি। আমি দেশের ও নির্বাচনী এলাকার মানুষের দোয়া চাই। আমার নির্বাচনী কার্যক্রম চলবে।’ তিনি নির্বাচনী এলাকার মানুষের উদ্যেশ্যে বলেন, ‘ ১৭ বছর কে বা কারা তাদের হয়ে সব জায়গায় কথা বলেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে তারা সেই জবাব দিবেন। মনোনয়নে আমার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। দাবী ছিল আমার একটাই, সেখানে জোটের প্রার্থী দিয়েন না। কিন্তু সেই দাবী বা আকুতির স্থান তাদের কাছে হয়নি। আল্লাহর রহমতে ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ আমাকে অসম্মানের জবাব দেবেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমার প্রতীক হতে পারে হাঁস।’