সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের উদ্যোগটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্বাস্থ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা দিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দেড়শ বিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করে তিন বছরের এ কর্মসূচি শুরুর মধ্য দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ শিক্ষার্থীদের জন্য ন্যূনতম পুষ্টির নিশ্চয়তা দিতে চেয়েছে। কিন্তু কর্মসূচির শুরুতেই বরিশাল বিভাগের আটটি উপজেলায় যে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে, তা উদ্যোগটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। পত্রপত্রিকা থেকে জানা গেছে, নির্দেশনামতে প্রতিদিন রুটি, বিস্কুট, ডিম, দুধ ও কলার মধ্যে অন্তত দুটি খাবার সরবরাহ করার কথা থাকলেও বাস্তবে দুধ ও বিস্কুট কোনোদিনই দেওয়া হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়েছে আগের দিন সেদ্ধ করা ডিম, পচা বা অতিরিক্ত পাকা কলা, যা খাওয়ার অনুপযোগী। দুপুর ১টার পরে খাদ্য পৌঁছানোয় প্রথম শিফটের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগে পরিষ্কার-সরবরাহের মান ও সময়-দুটোই ন্যূনতম মানদণ্ডে পৌঁছায় না। একটি শিশুর ভাষ্য-“কলা পচা, ডিম আগের দিন সেদ্ধ করা”-এই পুরো ব্যবস্থার ত্রুটি কতটা গভীর, তা স্পষ্ট করে। বরিশাল-১ প্যাকেজে প্রায় ৬৬ কোটি টাকার চুক্তি নিয়ে আইল্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানি ১ হাজার ২৪৮ বিদ্যালয়ে খাদ্য সরবরাহের দায়িত্ব পেয়েছে। তাদেরই নিয়োগ করা স্থানীয় এজেন্ট ও সাব-এজেন্টদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উঠছে। রাত ১০টায় খাদ্য বিদ্যালয়ে পৌঁছে পরদিন তা বিতরণের নজির যেমন আছে, তেমনি রয়েছে প্রতিদিনের ঘাটতি, বিলম্ব এবং মানহীনতার অভিযোগ। কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা একটি রুটি পেয়ে পরদিন অবশিষ্ট রুটি খেতে বাধ্য হচ্ছে-এই চিত্র একটি সরকারি পুষ্টি কর্মসূচির সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শিক্ষকরা ক্ষুব্ধ হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন, যা পরিস্থিতির গভীরতা বোঝায়। অনেক শিক্ষক জানিয়েছেন, মধ্যাহ্নভোজের খাবার প্রায়ই বেলা ২টার পরে পৌঁছায়, ফলে সকালের শিফটের শিশুদের কিছুই প্রাপ্য থাকে না। এ অব্যবস্থাপনা কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতার ফল নয়; এটি শিশুদের অধিকার ক্ষুণ্ন করা, যা সামাজিকভাবে আরও গুরুতর। পুষ্টিবিদরা বলেছেন, ডিম, দুধ, কলা ও গমজাত খাবার শিশুদের বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। কিন্তু যদি এসব খাবার মানসম্মত না হয়, তাহলে প্রতিদিন খাদ্য দিলেও শিশুর শরীরে পুষ্টির ঘাটতি থেকেই যাবে। অর্থাৎ বর্তমান অবস্থায় কর্মসূচিটি শুধু তার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থই নয়, বরং শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে জরুরি প্রয়োজন কার্যকর তদারকি, চুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক নজরদারি জোরদার করা। সরকারের সদিচ্ছা ও বরাদ্দ তখনই ফলপ্রসূ হবে, যখন মাঠপর্যায়ে সুশাসন ও দায়িত্ব পালনের কঠোর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে। শিশুদের পুষ্টি নিয়ে শৈথিল্য বা অবহেলার কোনো সুযোগ নেই-কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের দায়িত্বশীল নাগরিক।