এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক-কর্মচারী একই সঙ্গে একাধিক চাকরি বা লাভজনক পদে কেনো থাকতে পারবেন না এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা ‘এমপিও নীতিমালা-২০২৫’ ১৭ (ক ও খ) এর বিধান কেনো বাতিল ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পক্ষ হতে দায়ের করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানি পর বিচারপতি ইউসুফ আব্দুল্লাহ সুমন ও বিচারপতি দিহিদার মাসুদ কবির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চ ১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি এ রুল জারি করেন। গত ৭ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা ‘এমপিও নীতিমালা-২০২৫’ এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে এ রিট দায়ের করা হয়।আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শহিদউল্লাহ ও মিজান-উর রশিদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মহসিন কবির ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আরিফুল আলম। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন এমপিও নীতিমালায় বলা হয়, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক-কর্মচারী একই সঙ্গে একাধিক চাকরি বা লাভজনক পদে থাকতে পারবেন না এবং কর্মের বিনিময়ে কোন বেতন/ভাতা/সম্মানী নিতে পারবেন না। এরমধ্যে সাংবাদিকতা ও আইন পেশাও আছে। এটি করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও বাতিল করা যাবে। এই বিধান সন্নিবেশিত করায় বিপাকে পড়েন দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-সাংবাদিক। এদিকে বেসরকারি শিক্ষক সাংবাদিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের নেতারা দাবী করেছেন, দেশের এমপিওভূক্ত বহু বেসরকারি শিক্ষক রাজনীতি করছেন, জনপ্রতিনিধি হয়ে বেতন-ভাতা ও সম্মানী নিচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকগণ সরকারী ডিউটি পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চেম্বারে নিয়োজিত থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। সরকারি কর্মকর্তারা সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হতে বিভিন্ন সময় সম্মানি গ্রহণ করছেন। এতে কোন সমস্যা নেই। তাহলে বেসরকারি শিক্ষকরা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন পরবর্তী অবসর সময়ে সাংবাদিকতা করলে সমস্যা কোথায়? তাছাড়া সাংবাদিকতা একটা মেধা ও বুদ্ধি ভিত্তিক সৃজনশীল কাজ। মহৎ এই কাজের মাধ্যমে দেশ ও সমাজের অনেক উপকার করার সুযোগ রয়েছে। শিক্ষকদের সাংবাদিকতায় নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সংবিধানের আর্টিকেল ২৬ ও ২৭ ধারা লংঘন করা হয়েছে। তাছাড়া সাংবাদিকতায় বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকদের কোন নির্দিষ্ট অফিস টাইম নেই। তারা তাদের সুবিধামতো সময়ে এ কাজটি করে থাকেন। বিনিময়ে অধিকাংশ মিডিয়া হতে কোন নির্দিষ্ট বেতন ভাতাও দেয়া হয়না। কিছু কিছু গণমাধ্যম যৎসামান্য সম্মানি দেয় মাত্র। তারপরও তারা সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা হতে বহু বছর ধরে লেখালেখির এ কাজটি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সাংবাদিকতা শিক্ষকতার মতোই একটি মহতি কাজ। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে শিক্ষকদের সাংবাদিকতা তথা কন্ঠরোধ করা হচ্ছে। এতে দেশে মফস্বল সাংবাদিকতায় ধ্বস নামবে। অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত, সুযোগ-সন্ধানী, টাউট-বাটপার ও চাঁদাবাজরুপী কথিত সাংবাদিকদের দৌরাত্ম বৃদ্ধি পাবে। যা দেশ ও সমাজের জন্য অনেক ক্ষতির কারন হবে। বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক- সাংবাদিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের আহ্বায়ক মাসুদ হাসান বাদল বলেন, আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার বহাল রাখতে আদালতের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়েছি। আমরা শিক্ষকতায় কোন ধরনের গাফিলতি বা পেশার ক্ষতি না করেই সাংবাদিকতার মতো সমাজ সেবামূলক মহতি কাজের সাথে বহুবছর ধরে যুক্ত ছিলাম। এ থেকে আমরা কোন বেতন-ভাতও পাইনা। অল্প কিছু গণমাধ্যম যৎসামান্য সম্মানী ভাতা দিয়ে থাকে মাত্র। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি পৃথিবীর অনেক দেশে শিক্ষকরা শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করে থাকেন। তাদের মেধা, যোগ্যতা ও সৃজনশীলতাকে তাদের সরকার দেশের কাজে ব্যবহারের সুযোগ করে দেন। তাছাড়া আমাদের দেশে সাংবাদিকতার কোন নীতিমালা নেই। যে কারনে দেশে বিশেষ করে মফস্বলে ভয়াবহ আকারে অপ-সাংবাদিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অশিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত, সুযোগ সন্ধানী, অযোগ্যরা এ পেশায় ঢ়ুকে নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। ভালোমানের শিক্ষিত লোকজন মফস্বল সাংবাদিকতায় তেমন একটা আসতেই চান না। তারপরও মফস্বলে এখনো শিক্ষিত ও ভালোমানের সাংবাদিক রয়েছেন। তবে তারা সংখ্যায় খুবই কম। এমতাবস্থায় শিক্ষক তথা শিক্ষিত লোকদের হাত থেকে কলম কেড়ে নেয়া দেশ ও জাতির জন্য একটা ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত। আমরা এ সিদ্ধান্ত বাতিলে মহামান্য আদালত ও সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি। জানতে চাইলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মহসিন কবির বলেন, হাইকোর্ট নীতিমালার ওই বিধান নিয়ে শুধু রুল দিয়েছেন। রিট আবেদনকারীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শহিদউল্লাহ বলেন, নীতিমালার ১১.১৭ (ক) ও (খ) বিধি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়ে রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে।