মেহেরপুরের গাংনীতে সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে লাইসেন্সবিহীন অবৈধ ৪৫টি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। আইন লঙ্ঘন করে প্রভাবশালী একটি মহলের ছত্রছায়ায় এসব ইটভাটা পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসির। এসব ভাটার একটিরও কোন বৈধতা কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। প্রশাসনের উদাসিনতার কারনে দেদারছে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে ফসলি জমি বৃক্ষ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকলেও ইটভাটা তদারকি করার জন্য জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব থাকলেও রহস্যজনক নীরবতার কারণে অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। গত বছর ডিসেম্বর মাসে উপজেলার দুটি ইটভাটার চিমনি ভেঙে দেয় পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে অভিযানের কিছুদিনের মধ্যেই পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ করে পুনরায় নতুন চিমনি নির্মাণ করে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেন ইটভাটা মালিকরা। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩তে বলা হয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা অর্থাৎ জিগজ্যাগ ক্লিন, হাইব্রিড হফম্যান ক্লিন, ভার্টিক্যাল শফট ক্লিন, টানেল ক্লিন বা অনুরোপ উন্নততর কোনো প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। তাতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র কিংবা অনুমতি নিতে হবে। গাংনী উপজেলার কোন ইটভাটার বৈধতা না থাকলেও বীরদর্পে চলছে তাদের কার্যক্রম।সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলা বিভিন্ন এলাকায় ফসলি জমির মাটি কিনে ভ্যাকু ম্যাসিন দিয়ে কেটে ড্রাম ট্রাক দিয়ে ভাটায় এনে ইট তৈরি করছেন। আশপাশ এলাকার আবাদি জমির উর্বরতা হ্রাসসহ বিভিন্ন প্রজাতিয় ফলদ, বনজ গাছপালাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। এছাড়া ট্রলি দিয়ে মাটি বহনের ফলে রাস্তাগুলো ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যায়। এসব রাস্তা প্রায় প্রতি বছর মেরামত বাবদ খরচ হয় কোটি কোটি টাকা। ধুলোবালি কারনে রাস্তায় গাড়ি কিংবা হেটে গেলে রুমাল চেপে যেতে হয়। লাইসেন্সবিহীন তাদের এসব ইটভাটার চারপাশে মজুত করে রাখা হয়েছে হাজার হাজার মন কাঠ। ভাটাতে কাঠ পোড়ানোর ফলে চিমনি দিয়ে প্রচণ্ড বেগে ধোঁয়া বের হচ্ছে। আর সেই ধোঁয়া স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ আশপাশের বসতি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া শ্বাসকষ্ট, চর্ম,হাপানিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এলাকার গাছপালাও মরে যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাংনী উপজেলার দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ নষ্ট করে গড়ে তোলা হয়েছে ইটভাটা। বেশির ভাট ইটভাটা রয়েছে গাংনী থানা রোড,হাড়িয়াদহ রোড,হিজলবাড়িয়া রোড, পোড়াপাড়া,বামন্দী,কাজিপুর রোড,মটমুড়া, আকুবপুর,বাওট,নওদাপাড়া,তেরাইল সহ উপজেলার অন্তত ৪৫টি ইটভাটা রছেছে। এসব ভাটায় কোনোটিরই লাইসেন্স বা পরিবেশের ছাড়পত্র নেই। অলিনগর গ্রামের পথচারী শরিফুল ইসলাম বলেন, রাস্তায় হাঁটা তো দূরের কথা, চলাচল করাই কষ্টকর। ইটভাটায় মাটি বহনকারী যানবাহনের কারণে রাস্তায় পুরু মাটির স্তর জমেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়। গাংনী উপজেলা বন কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেন,এখন পর্যন্ত ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো হচ্ছে এ বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তবে প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করলে সহযোগিতা করা হয়। মেহেরপুর জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সঞ্জীব মৃধা বলেন, অনিয়ন্ত্রিত ইটভাটায় মাটি উত্তোলনের ফলে কৃষি জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব পড়বে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর মেহেরপুরের সহকারী পরিচালক শেখ মেহেদি কামাল জানান, ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা যাচ্ছে না। তবে দ্রত অভিযান চালানো হবে। মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক ড.সৈয়দ এনামুল কবীরের ব্যবহৃত সরকারী মোবাইল ফোনে কল দেয়া হলে তিনি রিসিভ করেনি।