সদ্য বিদায়ী ২০২৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান আমাদের সামনে এক গভীর উদ্বেগজনক বাস্তবতা হাজির করেছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জনের মৃত্যু এবং ১৪ হাজারের বেশি মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা কেবল সংখ্যাগত হিসাব নয়-এগুলো প্রতিটিই একটি করে পরিবার, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ হারানোর শোকগাথা। গত বছরের তুলনায় দুর্ঘটনা ও নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াটাই প্রমাণ করে, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনার পরও বাস্তব ফলাফল এখনও সন্তোষজনক নয়। উল্লেখযোগ্য দিক হলো মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি। মোট দুর্ঘটনার ৩৭ শতাংশ এবং নিহতের প্রায় ৩৯ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত-যা আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীর ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক আচরণ, লাইসেন্স ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ট্রাফিক শৃঙ্খলার ঘাটতির দিকে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি রেল ও নৌপথেও প্রাণহানি ঘটেছে, যা পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি তোলে। সংগঠনটির উপস্থাপিত সুপারিশসমূহের মধ্যে পরিবহনখাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ উন্নয়ন, সড়ক নিরাপত্তা উইং গঠন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি সহজ করা-এসবই দীর্ঘদিনের আলোচিত কিন্তু অপূর্ণ রয়ে যাওয়া সংস্কার উদ্যোগ। রাজনৈতিক ইশতেহার, বাজেট বরাদ্দ ও প্রশাসনিক কাঠামোয় সড়ক নিরাপত্তাকে স্পষ্ট অগ্রাধিকার দেওয়া হলে তা নীতিগত দায়িত্ববোধকে আরও দৃশ্যমান করবে। এছাড়া উন্নতমানের গণপরিবহন নেটওয়ার্ক, অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, বৈধ ও অবৈধ যানবাহনের জন্য পৃথক লেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার-এসব পদক্ষেপ কেবল সুপারিশ পর্যায়ে না রেখে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা দেখানো জরুরি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের পাশাপাশি যাত্রী ও ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হলে নীতিনির্ধারণে ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে। প্রতিবেদনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-সড়ক দুর্ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি কাঠামোগত ব্যর্থতা, অনিয়ম ও দীর্ঘদিনের অবহেলার সমষ্টি। সড়কে শৃঙ্খলা, প্রশিক্ষিত চালক, সঠিক লাইসেন্স, নিরাপদ যান ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন-এসব নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন ও অবকাঠামো সত্ত্বেও মানুষের জীবন সুরক্ষিত হবে না। এখন প্রয়োজন স্পষ্ট সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, শক্তিশালী মনিটরিং ও ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন। সড়ক নিরাপত্তা যেন কেবল পরিসংখ্যান নয়-রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব ও নাগরিক জীবনের অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিফলিত হয়, এটাই এখন জাতীয় প্রত্যাশা।