শীত মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানীজুড়ে গ্যাস সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আজিমপুর, হাজারীবাগ, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, খিলগাঁও, বাড্ডা, বাসাবো, রামপুরা, বনশ্রী, শাহজাহানপুর, উত্তরখান, দক্ষিণখানসহ প্রায় সব এলাকাতেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রান্নার জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না। চুলা জ্বলে মিটমিট করে, কখনো আবার একেবারেই নিভে যায়। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎচালিত হিটার কিংবা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছেন, যা তাদের গৃহস্থালির ব্যয় কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাসাবাড়ির পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলেও সংকট তীব্র। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, ভালুকা, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জের কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। পোশাক, সিরামিক, সিমেন্টসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উদ্যোক্তারা বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছেন- কেউ জুট বয়লারে রূপান্তর করছেন, কেউ সিলিন্ডার গ্যাসে ফ্যাক্টরি চালাচ্ছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, সময়মতো অর্ডার ডেলিভারি দিতে পারছেন না, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পেট্রোবাংলার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্যাসের দৈনিক চাহিদা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, অথচ সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২,৫০০-২,৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্থানীয় উৎপাদন গত বছরের তুলনায় কমে গেছে অন্তত ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে সরকারকে বেশি দামে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু শীতকালে কার্গো কম আনার কারণে সরবরাহ আরও কমে গেছে। ঢাকায় গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তিতাসের সিস্টেম লসও বেড়েই চলেছে। পাইপলাইনের ফাটল, অবৈধ সংযোগ, মিটার ত্রুটি ও অপচয়ের কারণে বিপুল পরিমাণ গ্যাস হারিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিস্টেম লস দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৭৯৬ এমএমসিএম, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। তিতাসের একজন কর্মকর্তা জানান, সরকার প্রতিবছর এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করে, তবে গরমকালে বেশি কার্গো আনা হয়, শীতকালে কম। ফলে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিকভাবে হ্রাস পায়। তিনি আরও জানান, স্থানীয় উৎস থেকেও গ্যাস আহরণ কমেছে। ফলে টোটাল সাপ্লাই কমে গেছে। সরকারি অগ্রাধিকার তালিকা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহে প্রথমে বিদ্যুৎ, এরপর সার, শিল্প, ক্যাপটিভ এবং সর্বশেষে আবাসিক খাত রাখা হয়। ফলে সাধারণ ভোক্তারা পড়ছেন সবচেয়ে বিপাকে। রাজধানীবাসীর অভিযোগ, প্রতি মাসে বিল পরিশোধের পরও গ্যাস না পাওয়া চরম অবিচার। কেউ কেউ বলছেন, সরকারি সংস্থার উদাসীনতা ও পরিকল্পনাহীনতার কারণে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। নাগরিক সমাজের প্রশ্ন- গ্যাস না থাকলে বিল কেন দিতে হবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাসাবাড়িতে গ্যাস না দিয়ে মাস শেষে বিল আদায় করা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। তাদের মতে, এলপিজির বাজার সমপ্রসারণই সরকারের মূল লক্ষ্য, আর এজন্য পরিকল্পিতভাবে বাসাবাড়িকে ন্যায্য গ্যাস প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তিতাস বলছে, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে স্বল্প জনবল নিয়ে কাজ করা হচ্ছে, তবে তা কার্যকরভাবে সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বৈধ গ্রাহকদের জন্য প্রয়োজন ১৫০-১৬০ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস, অথচ ১৭০-১৮০ মিলিয়ন দিয়েও কাভার করা যাচ্ছে না, কারণ অবৈধ সংযোগে গ্যাস চলে যাচ্ছে। শীতকাল আসার আগেই রাজধানীজুড়ে গ্যাস সংকটের এই চিত্র শুধু নাগরিক জীবনের দুর্ভোগ নয়, বরং এটি সরকারের জ্বালানি নীতির দুর্বলতা, তিতাসের অদক্ষতা এবং প্রশাসনিক অবহেলার প্রতিফলন। সংকট মোকাবিলায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই, নেই কোনো সময়সীমা বা সমাধানের রূপরেখা।