নতুন বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে মানসম্পন্ন পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার দায়িত্ব জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)-এর। প্রাথমিক স্তরে এবার সেই দায়িত্ব শতভাগ পূরণ হয়েছে। বিজয় দিবসের দিনই দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১১ কোটি ৭০ লাখ বই পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ব্রেইল পদ্ধতির বই এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষায় মুদ্রিত বইও সময়মতো পৌঁছে গেছে। কিন্তু মাধ্যমিক স্তরে চিত্র ভিন্ন। ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রায় শতভাগ বই হাতে পেলেও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পেয়েছে মাত্র ৭০ শতাংশ এবং অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পেয়েছে ৬০ শতাংশ বই। এনসিটিবি জানিয়েছে, ১৫ জানুয়ারির মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের সব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে শতভাগ বই পৌঁছে যাবে। তবে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত হিসাব বলছে, মাধ্যমিক স্তরের মোট ১৮ কোটি ৩২ লাখ বইয়ের মধ্যে মুদ্রণ হয়েছে ৭৮ শতাংশ এবং সরবরাহ হয়েছে মাত্র ৫৯ শতাংশ। অর্থাৎ এখনো প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ বই মুদ্রণ বাকি এবং ৭ কোটি ৫৭ লাখ বই সরবরাহ বাকি রয়েছে। এনসিটিবির চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী জানিয়েছেন, মাধ্যমিক ও কারিগরি স্তরের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের কাজ শেষ পর্যায়ে। তাঁর আশা, ১৫ জানুয়ারির মধ্যে শতভাগ বই সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, মান যাচাইয়ের কারণে এবার অতিরিক্ত ১ কোটি বইয়ের চাহিদা এড়ানো গেছে এবং ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি বই বাতিল করা হয়েছে। তবে বইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। প্রতিবছরই কিছু বই মানসম্পন্ন হলেও অনেক বই নিম্নমানের হয়ে থাকে। লেখালেখি হলে লোক দেখানো তদন্তে নামে এনসিটিবি, কিন্তু অনিয়ম চাপা পড়ে যায়। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে মানসম্পন্ন বই সরবরাহের অঙ্গীকার করা হয়। কিন্তু ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে দেখা যায়, দুটি প্রেসের ৮০ শতাংশ বইই ছিল নিম্নমানের। তদন্ত শুরু হলেও অজ্ঞাত কারণে তা থেমে যায়। ফলে ওই প্রেসগুলো পার পেয়ে যায়। সূত্র জানায়, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ৩০ কোটি বই ছাপা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রাথমিকের জন্য ৯ কোটি এবং মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ির জন্য ২১ কোটি বই। মোট বইয়ের এক দশমাংশেরও বেশি কাজ পেয়েছে একটি পরিবারের মালিকানাধীন চারটি প্রেস-অগ্রণী, কর্ণফুলী, কচুয়া ও আনোয়ারা। তারা ২০০ কোটিরও বেশি টাকার কাজ পেয়েছে, বইয়ের সংখ্যা তিন কোটিরও বেশি। এনসিটিবির অনুরোধ সত্ত্বেও তারা সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বইয়ের চুক্তি করেছে একেবারে শেষ সময়ে, ৪ ডিসেম্বর। ফলে এসব বই ছাপা শেষ করতে ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এনসিটিবির মানদণ্ড অনুযায়ী প্রাথমিক ও ইবতেদায়ির বইয়ে ৮০ জিএসএম ও ৮৫ ব্রাইটনেস থাকতে হবে, আর মাধ্যমিকে ৭০ জিএসএম ও ৮৫ ব্রাইটনেস। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, অগ্রণী ও কর্ণফুলী প্রেস ৯০ হাজার টাকায় প্রতি টন কাগজ কিনছে, যেখানে বাজার দর ১ লাখ ১৫ হাজার। এই কাগজে ভার্জিন পাল্প কম এবং রিসাইকেল কাগজ বেশি। ফলে ইবতেদায়ির বইয়ে ৮০ জিএসএমের বদলে ৬৫-৭০ জিএসএম কাগজ ব্যবহার করা হয়েছে, ব্রাইটনেসও কম। মাধ্যমিকের বইয়ে ৭০ জিএসএমের বদলে ৬০-৬৩ জিএসএম কাগজ ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জিএসএম কম হলে বই ছয় মাসের মধ্যে ছিঁড়ে যায়, আর ব্রাইটনেস কম হলে শিক্ষার্থীদের চোখে চাপ পড়ে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে চোখের সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই মানদণ্ডের বাইরে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এনসিটিবির সচিব প্রফেসর মো. সাহতাব উদ্দিন দাবি করেছেন, তারা প্রতিদিন একাধিক প্রেস পরিদর্শন করছেন। মন্ত্রণালয়ের টিমও কাজ করছে। যদি নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, নোয়াখালীতে অবস্থিত প্রেসগুলোতে পরিদর্শনে গেলে নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়তে হয়। এমনকি এক কর্মকর্তার কাছ থেকে কাগজের স্যাম্পল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। প্রেসগুলোর বিরুদ্ধে প্রাথমিক স্তরেও নিম্নমানের বই সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম জাকিরুল হাসান গত অক্টোবরে এনসিটিবিকে চিঠি দিয়ে জানান, অগ্রণী প্রেস থেকে সরবরাহ করা প্রাক-প্রাথমিকের বই নিম্নমানের হওয়ায় তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সমপ্রতি আনোয়ারা ও কচুয়া প্রেসের নবম শ্রেণির বইও মানহীন হওয়ায় এনসিটিবি কেটে দিয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক স্তরে বই উৎসব হলেও মাধ্যমিক স্তরে বই সংকট ও মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা নতুন বছরের শুরুতে শতভাগ বই হাতে পাচ্ছে না, আর যারা পাচ্ছে তাদের অনেকের বই মানসম্পন্ন নয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে- এনসিটিবি কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্পন্ন বই পৌঁছে দিতে পারছে?