শ্রমিক ইশতেহার বাস্তবায়নে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের সহযোগিতার প্রত্যাশা এলায়েন্স-এর

প্রেস বিজ্ঞপ্তি | প্রকাশ: ১২ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:০২ পিএম
শ্রমিক ইশতেহার বাস্তবায়নে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের সহযোগিতার প্রত্যাশা এলায়েন্স-এর

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬-এ শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও প্রত্যাশাকে রাজনৈতিক দলসমুহের কাছে তুলে ধরতে জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ও শ্রমিক অধিকার সংগঠনসমূহের সমন্বয়ে গঠিত শ্রমিক অধিকার জাতীয় এডভোকেসি এলায়েন্সের পক্ষ থেকে শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এবং স্কপ-এর ৯ দফা দাবির ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্তির জন্য যে ‘শ্রমিক ইশতেহার’টি প্রণয়ন করা হয়েছে, তা রাজনৈতিক দলসহ সকল পক্ষের কাছে উপস্থাপনের জন্য সোমবার (১২ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওস্থ বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে একটি ”জাতীয় অংশীজন কনভেনশন” আয়োজন করা হয়। এলায়েন্স-এর পক্ষ থেকে এলায়েন্স সচিবালয়, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ–বিলস আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা–আইএলও-এর সহযোগিতায় কনভেনশনটির আয়োজন করে। এলায়েন্স এর আহ্বায়ক ও বিলস মহাসচিব নজরুল ইসলাম খান কনভেনশনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন আইএলও বাংলাদেশ এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন। শ্রমিক ইশতেহারের মূল বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেন এলায়েন্স-এর সদস্য সচিব ও বিলস নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ। অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে এলায়েন্স এর আহ্বায়ক ও বিলস মহাসচিব নজরুল ইসলাম খান উল্লেখ করেন, যারা ক্ষমতায় আসবেন তারা যেমন এই ইশতেহারের সুপারিশমালা বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকবেন তেমনি যারা বিরোধী দলে থাকবেন তারাও এর বাস্তবায়নে সহযোগিতা ও চাপ প্রয়োগ করবেন। শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) এর যুগ্ম-আহবায়ক আবদুল কাদের হাওলাদার বলেন, আমরা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে চাই। তাই আমাদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কাজ এবং জীবনধারণের জন্য পর্যাপ্ত মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট আহসানুল মাহমুদ জোবায়ের বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের ইস্যু থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে রাজনৈতিক দলগুলো শ্রমিক অধিকার বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকবেন বলে তিনি মনে করেন। শ্রমিক ইশতেহার তাদের দল দেশের আপামর জনগণের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করে সর্বসাধারণের জন্য একটি মেনিফেস্টো তৈরী করছে বলে জানান। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, শ্রমজীবী মানুষ তার অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হলে তাদের নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়। শ্রমিকদের দাবী মেনে নেওয়া কোন দয়া নয়, উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের ন্যায্য দাবীর প্রতি সম্মান রেখে তার দল শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থাকবে। কানাডিয়ান হাই কমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি ফিলিপ বার্নিয়ার আর্কান্ড উল্লেখ করেন, তার দেশ শ্রমিক ইশতেহার বাস্তবায়নের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।  ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশ ডেলিগেশনে ট্রেড অ্যাডভাইজার আবু সাঈদ বেলাল বলেন, শ্রম সংস্কারের ধারবাহিকতা বজায় রাখতে হবে, যাতে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এটিকে এগিয়ে নেয়া যায়। গণফোরামের সাধারন সম্পাদক ডাঃ মোঃ মিজানুর রহমান শ্রমিকদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, বিশ্ব শ্রমবাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এর কোন বিকল্প নেই এবং তাদের দল এটি বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকবে। আইটিইউসি এশিয়া- প্যাসিফিক এর ওয়ার্কার্স' রাইটস ডিরেক্টর এস এম ফাহিমুদ্দিন পাশা অনলাইনে যুক্ত হয়ে বলেন শ্রমিকের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে শ্রমিক ইশতেহার একটি শক্তিশালী উদ্যোগ হিসেবে কাজ করবে।  তার পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ ট্রেড ইউনিয়নস (ডব্লিইএফটিইউ) এর ডেপুটি জেনারেল সেক্রেটারি সি. শ্রীকুমার আশা প্রকাশ করে বলেন, শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশের আলোকে প্রণীত শ্রমিক ইশতেহার বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকার বাস্তবায়নে একটি শক্তিশালী সহায়ক ভূমিকা হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, বর্তমানে শ্রমিক আন্দোলন ক্রমশই স্তিমিত হচ্ছে এবং তাদের দাবী আদায়ের বিষয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা কমে আসছে। তিনি এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান। শ্রমিক অধিকার পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান বলেন, যারা শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন তারা যেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হতে পারেন। অন্তর্বর্তীকালীর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে কোন শ্রমিক প্রতিনিধি নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে বৈষম্য হয়েছে। তিনি শ্রমঘন এলাকায় শ্রমিকদের নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনার বিষয়ে তিনি দাবী জানান। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, মেহনতি মানুষদের ক্ষমতার অংশীদারিত্ব দিতে হবে যাতে তারা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন। তিনি এ ক্ষত্রে সংসদের উচ্চ কক্ষে শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব রাখার দাবীটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, এটি নিশ্চিত করতে পারলে শ্রমিকদের দাবী আদায়ের জন্য বারবার রাস্তায় নামতে হবে না। তিনি শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম বলেন, সকল শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় তার দল কাজ করবে এবং ন্যূনতম মজুরি কমিশন ও শ্রম সংস্কারে স্থায়ী কমিশন গঠনের ব্যাপারে তার দল প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আক্তার বলেন, সকল শ্রমিককে শ্রম আইনে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে তার দল সচেষ্ট থাকবে এবং তাদের জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ও সামাজিক ন্যাবিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাবে। গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোশরেফা মিশু বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে শ্রমিক ইশতেহারের ভবিষ্যত। গত ৫৪ বছরে শ্রমিকের অধিকার যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা হয় নি মন্তব্য করে তিনি সত্যিকার অর্থে শোষণমুক্ত এবয় সাম্যের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। বাসদ (মার্কসবাদী) এর সদস্য রাশেদ শাহরিয়ার শ্রমিক ইশতেহারকে স্বাগত জানিয়ে এটি বাস্তবায়নে তার দলের প্রতিশ্রুতির কথা জোর দিয়ে উল্লেখ করেন।সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহিল ক্বাফি রতন বলেন, ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার থেকে শ্রমিকরা ক্রমশই বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তারা তাদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হতে পারছেন না। তিনি শ্রমিক ইশতেহারকে তার দলের পক্ষ থেকে পুর্ণ সমর্থন জানান। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ স্কপ, শ্রম সংস্কার কমিশন ও শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরামের বিভিন্ন দাবীর আলোকে প্রণীত শ্রমিক ইশতেহারকে তার দলের পক্ষ থেকে স্বাগত জানিয়ে তিনি এতে আধুনিকায়নে সম্ভাব্য আরও সুপারিশ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বিনা জামানতে শ্রমিকের পেনশন স্কীম প্রদান ও দিবাযত্ন কেন্দ্রে বিষয়গুলোর ওপরেও গুরুত্ব আরোপ করেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি ‘র  স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, শ্রমিক ইশতেহারে যে সমস্ত দাবী উল্লেখ করা হয়েছে শত বছর ধরেই সেই সব দাবী উত্থাপিত হয়ে আসছে, তবে কখনই এর যথাযথ বাস্তবায়ন হয় নি। তিনি নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, শ্রমিকদের দাবীর সঠিক বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সরকারে যারা থাকবেন তাদের এ কথাটির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে। শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষে আইএলও’র কাছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শ্রম সংস্কারের যে রোডম্যাপ দেয়া হয়েছে, আগামী নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হবে বলে আশা প্রকাশ করেন ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন। এ ক্ষেত্রে আইএলও পুর্ণ সহযোগিতা করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কনভেনশনে শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরামের পক্ষ থেকে এর ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব সেকেন্দার আলী মিনা বক্তব্য রাখেন। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে মেসবাহউদ্দীন আহমেদ বলেন, সকল রাজনৈতিক দল, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নাগরিক সমাজের পরামর্শ ও সহযোগিতায় শ্রমিক অধিকার সুনিশ্চিত সুনিশ্চিত হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন এবং এ ক্ষেত্রে সকল পক্ষের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। কনভেনশনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ইউএন এজেন্সিসমুহ, বিভিন্ন দূতাবাস, জাতীয় ও সেক্টরাল ট্রেড ইউনিয়নসমুহ, শ্রমিক অধিকার নিয়ে কর্মরত সংগঠন ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাসমুহের প্রতিনিধি ও কর্মকর্তাবৃন্দসহ, নাগরিক সমাজের ব্যক্তিত্ব, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও শ্রমজগতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন উপস্থিত ছিলেন।  

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে