স্বামীর বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, সামাজিক অস্থিরতা এবং ধর্মীয় অনুশাসনের অভাবে বরিশালে আশঙ্কাজনকহারে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা বেড়েই চলেছে। গত দুই বছরে রেজিস্ট্রেশনকৃত বিয়ের প্রায় অর্ধেকই বিচ্ছেদ হয়েছে। আর এ বিচ্ছেদের আবেদনে পুরুষদের তুলনায় নারীদের সংখ্যা বেশি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তুচ্ছ বিষয় এবং মন-মালিন্যের ঘটনায় প্রতিনিয়ত বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা বেড়েই চলেছে। সম্পর্কের আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে কেউ কেউ বিষপান করে আত্মহত্যাও করেছেন। সর্বশেষ ১৮ জানুয়ারি বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন জান্নাত আক্তার নামের নববিবাহিত এক গৃহবধূ। প্রেমের সম্পর্কে বিয়ের চার মাসের মধ্যে প্রকৌশলী স্বামী ডিভোর্স দেওয়াকে মেনে নিতে পারেননি জান্নাত আক্তার। ফলে অভিমানে গত ১২ জানুয়ারি বিষপান করে বরিশাল নগরীর মুক্তিযোদ্ধা পার্কের গাছতলায় সে শুয়ে ছিলেন। সেখান থেকে মুমূর্ষ অবস্থায় জান্নাতকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিলো। টানা পাঁচদিন বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ জানুয়ারি মৃত্যুর কাছে হেরে যায় জান্নাত আক্তার। মৃত জান্নাত বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নের বুখাইনগর এলাকার বাসিন্দা। অভিযুক্ত স্বামী প্রকৌশলী সিদ্দিকুর রহমান সাগর একই উপজেলার সাহেবের হাটের বাসিন্দা। মারা যাওয়ার আগে জান্নাত আক্তার বলেছিলেন, প্রেমের সম্পর্কে গত চার মাস আগে আমরা বিয়ে করেছি। বিয়ের চার মাসের মধ্যে বিনাকারণে আমাকে তালাক দেয় স্বামী প্রকৌশলী সাগর। এরপর আমি নিজ পরিবারে ফিরতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। যেকারণে আমি বিষপানে বাধ্য হয়েছি। অপরদিকে বরিশাল মহানগরীর নথুল্লাবাদ এলাকার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম সম্প্রতি স্ত্রী, সন্তান ও শ্বশুর বাড়ির স্বজনদের ওপর আস্থা হারিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে কীটনাশক পানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তবে ভাগ্যক্রমে চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। রফিকুল ইসলাম বলেন, পরিবার ও সংসার জীবনে আস্থা হারিয়ে আত্মহত্যার পথ বেঁছে নিয়েছিলাম। অপরদিকে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্রধরে প্রেম অতঃপর বিয়ের ঘটনায়ও বিচ্ছেদের ঘটনা বৃদ্ধি করেছে। যৌতুক ও পরকীয়ার কারণেও সংসার ভাঙার ঘটনা বাড়ছে। দুই বছর আগে ফেসবুকে পরিচয়ের মাধ্যমে ঢাকার এক যুবকের সাথে পরিবারের অমতে বিয়ে হয়েছিলো নগরীর বাসিন্দা সালমা আক্তারের। বিয়ের শুরুতে সব ঠিক থাকলেও কয়েকদিন পরেই যৌতুকের দাবিতে সালমার ওপর শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। একবছরের মধ্যে ভেঙে যায় তাদের বিয়ের সম্পর্ক। অসংখ্য ভূক্তভোগী নারীরা জানিয়েছেন, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি এবং অনলাইন জুয়ায় আসক্তির কারণে তারা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বাধ্য হয়ে তারা স্বামীকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য হয়েছেন। বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, শহরে গড়ে প্রতিদিন নয়টি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। গত দুই বছরে বরিশালে ১৮ হাজার ৬৪৪টি বিয়ের বিপরীতে বিচ্ছেদ হয়েছে ৬ হাজার ৩৫২টি। এরমধ্যে ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৬৬৬টি রেজিস্ট্রি বিয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়েছে ৩ হাজার ৫টি বিয়ে। ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৯৭৮টি রেজিস্ট্রি বিয়ের মধ্যে ৩ হাজার ৩৪৭টি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, ধৈর্যহীনতা এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের বৃদ্ধি এই সংকট তীব্র করেছে। নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বরিশাল আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান মৃধা বলেন, বিবাহ বিচ্ছেদের যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আদালতে প্রতিনিয়ত এ সংক্রান্ত মামলার ঘটনা বেড়েই চলেছে। অধিকাংশ মামলার পিছনে অভিযোগ রয়েছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর ঘটনা। ব্লাস্ট বরিশালের কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট শাহিদা বেগম বলেন, ধর্মীয় অনুশাসন না মেনে চলার কারণে বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ছে। এটি কমাতে পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার মোহসীন মিয়া বলেন, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিভোর্স বা তালাকের ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে রয়েছেন। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে এটি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।