স্ত্রী ও নয় মাসের শিশুপুত্রকে হারানোর পর উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের পরিবারে কোনো স্বস্তি ফিরেনি। বরং তাদের কণ্ঠে এখন একটাই প্রশ্ন, স্ত্রী-সন্তান যখন আর বেঁচে নেই, তখন এই জামিনের অর্থ কী।
সাদ্দামের মা দেলোয়ারা একরাম বলেন, জামিনের খবর শুনে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তার কথায়, “জামিন হয়েছে, ভালো কথা। কিন্তু এখন জামিন হওয়া আর না হওয়া সমান। ছেলে বাড়ি ফিরে স্ত্রী আর সন্তানের কবর দেখবে, এই জামিনে কী হবে?” তিনি জানান, এর আগেও একাধিকবার জামিনের চেষ্টা করা হয়েছিল। কোনো মামলায় জামিন মিললেও অন্য মামলায় আটকে যেতে হয়েছে সাদ্দামকে।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, স্ত্রী-সন্তান বেঁচে থাকতে যদি একদিনের জন্যও জামিন মিলত, তাহলে এমন নির্মম পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতো না। সাদ্দামের মামা হেমায়েত উদ্দিন জানান, প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করেও তারা ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি বলেন, “প্যারোলে মুক্তি পাইনি। এখন জামিন পাওয়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানাই, কিন্তু কষ্ট তো থেকেই গেল।”
প্যারোলে মুক্তি না দেওয়ার বিষয়টি অমানবিক উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাদ্দামের শ্বশুর ও জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতা রুহুল আমিন হাওলাদার। তার ভাষায়, “রাষ্ট্রকে ব্যাখ্যা দিতে হবে, কেন এমন পরিস্থিতিতে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি।” একই সুরে সাদ্দামের শ্যালক শাহনেওয়াজ আমিন শুভ বলেন, “এই জামিনে কী লাভ। দেশে এখন সবকিছুই নাটক মনে হয়।”
সোমবার হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঁইয়ার বেঞ্চ সাদ্দামের জামিন মঞ্জুর করেন। আদালতে তার পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা।
জুয়েল হাসান সাদ্দাম বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা এলাকার একরাম হাওলাদার ও দেলোয়ারা একরামের ছেলে। তিনি নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের উপজেলা সভাপতি ছিলেন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে ২০২৫ সালের ৫ এপ্রিল গোপালগঞ্জ থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন মামলায় কারাগারে ছিলেন।
এরই মধ্যে শুক্রবার দুপুরে সাবেকডাঙ্গা গ্রামে সাদ্দামের বাড়ি থেকে তার স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা ওরফে স্বর্ণালী (২২) এবং তাদের নয় মাসের শিশুপুত্র সেজাদ হাসান নাজিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সাদ্দাম কারাগারে থাকা অবস্থাতেই তার ছেলের জন্ম হয়েছিল।
পরদিন শনিবার বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বর্ণালীর বাবার বাড়িতে নেওয়া হয়। বিকেলে লাশবাহী গাড়িতে করে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে সাদ্দাম শেষবারের মতো স্ত্রী ও সন্তানকে দেখেন। পরে রাতে জানাজা শেষে মা ও ছেলেকে পাশাপাশি দাফন করা হয়।
স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর পরও সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়াকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে জামিনের আদেশ এলেও পরিবার বলছে, এই মুক্তি তাদের জীবনের শূন্যতা পূরণ করতে পারেনি।