দেশের কারাগারগুলোতে তীব্র চিকিৎসক সঙ্কট বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরেই বিরাজ করছে এমন পরিস্থিতি। ফলে বন্দিদের সময় মতো সুচিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয় না। বর্তমানে দেশের ৭৫ কারা হাসপাতালে মাত্র ১০৩ জন চিকিৎসক রয়েছেন। তার মধ্যে স্থায়ী চিকিৎসক মাত্র দুজন। তাদের একজন মানিকগঞ্জ জেলা কারাগার ও অন্যজন রাজশাহীর ট্রেনিং সেন্টারে রয়েছেন। কারাগারে স্থায়ী চিকিৎসক না থাকায় জেলার সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে কারা হাসপাতালে অস্থায়ী ভিত্তিতে চিকিৎসক পাঠানো হয়। কিন্তু অস্থায়ী চিকিৎসকরা সকালে এসে দুপুরের পর অথবা বিকেলে চলে যায়। ফলে রাতে কোনো বন্দি অসুস্থ হলে তাদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা হয়ে পড়ে কঠিন। কারাবন্দিদের অনেকে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত থাকেন। বিভিন্ন রোগে কারাগারে মারা গেছে ২০২১ সালে ২০৫ জন, ২০২২ সালে ১৩২ জন, ২০২৩ সালে ২২৭ জন এবং ২০২৪ সালে ১৭৯ জন কারাবন্দি। কারা অধিদপ্তর ও মানবাধিকার সংগঠন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের কারাগারগুলোতে বছরে গড়ে ২০০ বন্দির মৃত্যু হয়। বিগত ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের কারাগারে এক হাজার ৪১০ বন্দি মারা যায়। আর ২০২৫ সালে কারা হেফাজতে ১০৭ জন মারা গেছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৫। বর্তমানে দেশের ৭৫টি কারাগারে প্রায় সাড়ে ৮৪ হাজার বন্দি রয়েছে। তার মধ্যে হাজতি ৬৩ হাজারেরও বেশি আর কয়েদি ২১ হাজার। কারাগারাগুলোর ৪৬ হাজার বন্দির ধারণক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে কারাগারে রয়েছে ৩৮ হাজার ৪০০ জন বেশি বন্দি। তার মধ্যে ১৯০ জন ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন।
সূত্র জানায়, দেশের কারাগারগুলোতে প্রায় তিন হাজার ৯০০ জন নারী বন্দি রয়েছে। তাছাড়া কারাগারে রয়েছে ২৭০ শিশু তাদের মায়ের সঙ্গে। ওই শিশুদের শৈশব কারাগারে চার দেয়ালে বন্দি। সাধারণত মায়েদের সঙ্গেই সেলে ৬ বছরের কম বয়সী শিশুরা কারাগারের অবস্থান করে। তবে মায়ের সঙ্গে কারাগারে যাওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট শিশুর নাম ও বয়স রেজিস্টারে নথিভুক্ত করা হয়। তাছাড়া দেশের সব কারাগারে ৬০০ জন মানসিক রোগী থাকলেও কোনো মানসিক চিকিৎসক নেই। নিয়মানুযায়ী প্রতিটি কারাগারে একজন মানসিক চিকিৎসক থাকার কথা। আর নারী বন্দিদের জন্য নেই কোনো গাইনি চিকিৎসক।
সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে ৪১৮ জন বিদেশি নাগরিক বন্দি আছে। মাদক চোরাচালান, অবৈধ উপায়ে স্বর্ণ পাচার, প্রতারণা, জাল ডলার ব্যবসা, পাসপোর্ট জটিলতা, অবৈধ ভিওআইপির ব্যবসা ও মানব পাচারের অভিযোগে তারা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছে। তাদের অনেকের বৈধ কাগজ নেই। তারা নিজের দেশের নাম বললেও সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস তাদের নাগরিক হিসেবে মানতে নারাজ। বন্দিদের পরিচয় সম্পর্কে জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসে চিঠি দিয়ে যোগাযোগ করা হলেও সময়মতো উত্তর মেলে না। ফলে সরকারের বাড়তি টাকা ব্যয় হচ্ছে। পাশাপাশি ওসব বন্দি বেশির ভাগ সময়ই উগ্র আচরণ করে। বিশেষ করে আফ্রিকা অঞ্চলের নাগরিকদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ বেশি। যে কারণে তাদের সামলাতেও বাড়তি কারারক্ষী মোতায়েন করতে হয়।
এদিকে এ প্রসঙ্গে সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত-উল ফরহাদ জানান, জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য অনেক বন্দিকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হয়। বন্দিদের হাসপাতালে আনা-নেয়ার জন্যর অ্যাম্বুলেন্স সংকট রয়েছে। বর্তমানে ২৭টি অ্যাম্বুলেন্স আছে। কারাগারের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসক অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকলে বন্দিরা ভালো সেবা পেত।
অন্যদিকে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, কারাগারের চিকিৎসক সংকট দূর করতে একের পর এক বৈঠক করা হচ্ছে। তবে এখনও সুরাহা হয়নি। কারাগারের জন্য খুব জরুরি মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ।