এক সময় দেশের সবুজ বন-বনানী পশু-পাখির হাঁক-ডাকে মুখরিত ছিল। পাখির ডাকে ঘুম ভাঙতো পল্লীগ্রামের মানুষের। আজ সেদিনগুলো হারিয়ে গেছে। ভারসাম্য হারাচ্ছে দেশের প্রকৃতি। দ্রুত বদলে যাচ্ছে আবহাওয়া এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ। পরিবেশবিদরা এ জন্য নির্বিচারে বনজ সম্পদ উজাড়, অব্যাহতভাবে পাহাড় কাটা এবং জুম চাষের নামে পাহাড়ে অগ্নিসংযোগকে দায়ি করেছেন। দেশের বিভিন্ন অরণ্যে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে এক সময় হাতি, হরিণ, ছোট বাঘ, ভাল্লুক, উল্লুক, বানর, হনুমান, গয়াল, বনবিড়াল, শিয়াল, বনমোরগ, ধনেশ, শকুন, ঘুঘু, শালিক, চড়াই, ময়না, টিয়া, বুলবুলি, চিল, খঞ্জনাসহ নানান ধরনের পশু-পাখি দেখা যেত। এসব অনেক প্রণীর অস্তিত্ব এখন আর নেই। আবাসস্থল হারিয়ে যেমন ক্রমেই হুমকির মুখে দেশের বন্যপ্রাণী তেমনি আবার বন উজাড়ে কমছে খাদ্যের জোগান। বাংলাদেশে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গত কয়েক দশকে দেশের মোট বনের পরিমাণ ক্রমাগত কমছে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনের ওপর মানুষের আগ্রাসন সবচেয়ে বেশি। নতুন রাস্তা, রিসোর্ট, কৃষিজমি, গার্মেন্ট বা ইটভাটা তৈরি করার জন্য গাছ কাটা যেন এক ধরনের গ্রহণযোগ্য কর্মকা্লে পরিণত হয়েছে। মানুষ ভাবে, একটি গাছ কেটে কিছু হবে না; কিন্তু যখন প্রতিদিন হাজার হাজার গাছ বাদ পড়ে, তখন শুধু বনই নয়, পুরো ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়ে। বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়, তা একটি জীবন্ত পৃথিবী; যেখানে প্রাণী, পাখি, মাটি, পানি, পোকামাকড় সব মিলেই তৈরি হয় একটি সমন্বিত জীবনচক্র। এই জীবনচক্র ভেঙে গেলে প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। বনের ধ্বংসের কারণে যেসব বন্যপ্রাণী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের মধ্যে আছে বাঘ, হাতি, হরিণ, বানর, গুইসাপ, নানা প্রজাতির পাখি এবং অসংখ্য ক্ষুদ্র জীব। বিশেষ করে সুন্দরবনের বাঘ এখন প্রকৃত সংকটের মুখে। একসময় এই অঞ্চলে বাঘের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি, কিন্তু বন সংকোচন, মানুষের অনুপ্রবেশ, বন দখল, শিকার সব মিলিয়ে বাঘ এখন প্রায় বিলুপ্তির প্রান্তে। একইভাবে পাহাড়ি এলাকার এশিয়ান হাতি তার স্বাভাবিক খাদ্যভূমি হারিয়ে মানুষের বসতিতে ঢুকে যাচ্ছে, আর সংঘর্ষে মানুষ ও হাতি উভয়ের প্রাণহানি ঘটছে। বন্যপ্রাণীর এই বিচরণভূমি সংকুচিত হওয়ার ফলে প্রাণীরা বাধ্য হচ্ছে তাদের পথ পরিবর্তন করতে, ফলে তারা মানুষের সঙ্গে আগের তুলনায় অনেক বেশি সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। এটি শুধু প্রাণীদের জন্য বিপদ নয়, মানুষের জন্যও বড় ধরনের আতঙ্কের কারণ। আমরা যদি বনের ওপর অত্যাচার চালাতে থাকি, একসময় সেই বনের উত্তাল প্রতিশোধ আমাদেরই মোকাবিলা করতে হবে।