জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যারা নিজেদের দল সামলাতে পারেনা তারা দেশ চালাবে কিভাবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তারা নিরিহ মানুষদের মামলা দিয়ে খাজনাপাতি তুলেছে। মানুষ তাদের প্রতি অতিষ্ঠ।
তিনি আরও বলেছেন, এদেশে সবচেয়ে বড় মজলুম দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিচারিক হত্যাকান্ডসহ নানা নিপিড়ন হয়েছে। তবুও জনগণের স্বার্থে কথা বলা বন্ধ করিনি। জুলাই বিপ্লবের পরিবর্তনের পর আমরা কোন নির্দোষ নীরিহ মানুষকে হয়রানী করিনি কিন্তু একটি বড় দলের লোক মামলা বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও দখলবাজিতে লিপ্ত হয়ে পরে এদেশের সাধারণ মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টায় নদীবেষ্টিত বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার সরকারি আর.সি কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেছেন, পাকিস্তানের বৈষম্য আচরণের কারনে মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত, তার মাধ্যমে আমরা পেয়েছি বাংলাদেশ। এরপর আবার শোসন নৈরাজ্য করলো আওয়ামী লীগ। পরবর্তী সময়ে বার বার ক্ষমতার হাত বদল হলেও জাতির ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি।
জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনা প্রতিষ্ঠায় ১১ দলীয় জোট বদ্ধ পরিকর ও দুর্নীতির মূলোৎপাটন করার অঙ্গিকার করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আল্লাহ যদি আমাদেরকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ দেয় তাহলে সকলকে তার ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিবো। পাচার হওয়া টাকা ওদের পেট থেকে বের করে আনা হবে। কেননা অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ হবে বড় চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের অবহেলিত জনপদের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, তুমিও তো মায়ের সন্তান, তাহলে আরেক মাকে কেন সম্মান দিতে পারোনা? মায়েদের নিরাপত্তায় আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আইডি হ্যাক হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, মিসাইল ছুড়েছিল আমার দিকে কিন্তু ফিরে সেটা তাদের কপালেই পড়েছে। সত্য কখনো চাঁপা থাকেনা। যে রাজনীতি চাঁদাবাজ, হত্যাকারী লুন্ঠনকারী তৈরি করে, ওই রাজনীতি আমরা চাইনা। তাই পরিবর্তনের জন্য ‘হ্যা’ ভোট দিতে হবে।
এতোদিন দলের পাহারাদারি করেছি, এবার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আপনারা সুযোগ দিলে দেশের পাহারাদারি করবো উল্লেখ করে আমিরে জামায়াত বলেন, ক্ষমতায় গেলে জামায়াত নিজেরা চাঁদাবাজি করবে না এবং কাউকে চাঁদাবাজি করতেও দেবেনা। বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে দুর্নীতির ঘাড় ধরে টান দেওয়া হবে। দেশের ২৮ লাখ কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এই টাকা ফেরত আনতে হলে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজন। যারা লুটপাটের সাথে জড়িত, তারা কখনো ওই অর্থ ফিরিয়ে আনতে পারবে না। তাই লুটপাটমুক্ত নেতৃত্বকেই ক্ষমতায় আনতে হবে।
দলের ওপর নির্যাতনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত দল। বিচারিক প্রক্রিয়ার নামে আমাদের ১১ জন শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। হাজারো নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন, বহু মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। তবুও আমরা প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করিনা। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর জামায়াত প্রতিহিংসার পথে হাঁটেনি। তবে শহীদ পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্থদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইনী সহায়তা দেওয়া হবে। একইসাথে মিথ্যা মামলা ও মামলা বাণিজ্যের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা হবে।
নারী ও যুব সমাজ নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বেকার ভাতা দিয়ে নয়; কর্মসংস্থানের মাধ্যমে যুবকদের সম্মান নিশ্চিত করতে চায় জামায়াত। নারীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সম্মান শতভাগ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। বরিশাল অঞ্চলের সমস্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই অঞ্চলের অন্যতম বড় সমস্যা নদীভাঙন। শুধু নদী শাসন নয়; সঠিকভাবে নদী সংস্কার করা জরুরি। পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে এক দশকের মধ্যেই এই অঞ্চলের চিত্র বদলে যাবে।
তিনি আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামীর কাছে দলীয় বিজয়ের চেয়ে জনগণের বিজয়ই মুখ্য। আমরা বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠণ করতে চাই, যেখানে রাষ্ট্রপতি থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই আইনের চোখে সমান থাকবে। জামায়াতের আমির দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে দুর্নীতি থাকবে না, চাঁদাবাজি থাকবে না, মানুষ নিরাপদে ও সম্মানের সাথে বসবাস করতে পারবেন।
অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, বরিশাল অঞ্চলের টিম সদস্য একেএম ফখরুদ্দিন খান রাজী, বরিশাল জেলা আমির ও বরিশাল-৪ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী অধ্যাপক আব্দুল জব্বার, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল-৩ আসনের প্রার্থী ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও বরিশাল-৬ আসনের প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুন্নবী তালুকদার, বরিশাল-২ আসনের প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মাস্টার আব্দুল মান্নান, বরিশাল-১ আসনের জামায়াতে ইসলাম মনোনীত দাঁড়িপাল্লা মার্কার প্রার্থী হাফেজ মাওলানা মো. কামরুল ইসলাম খান, বরিশাল জেলা এনসিপির আহবায়ক আবু সাঈদ মুসা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের জেলা সভাপতি মাওলানা জোবায়ের গালিব, জাগপা’র জেলা সভাপতি মনির হোসেন, খেলাফত মজলিশের জেলা শাখার সহ-সভাপতি রুহুল আমীন কামাল। বক্তব্য রাখেন, বরিশাল প্রেসক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম খসরু, মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির প্রফেসর মাহমুদ হোসাইন দুলাল, জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাইয়্যেদ আহমেদ প্রমুখ। সবশেষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বরিশাল জেলার সংসদীয় আসনের মনোনীত প্রার্থী ও জোট সমর্থিত প্রার্থীদের হাতে প্রতীক তুলে দিয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাদের বিজয়ী করার জন্য সর্বস্তরের ভোটারদের প্রতি আহবান করেন।