নীতিসুদ হার ১০ শতাংশই থাকছে, ঋণপ্রবাহ বাড়াতে এসডিএফ কমাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম
নীতিসুদ হার ১০ শতাংশই থাকছে, ঋণপ্রবাহ বাড়াতে এসডিএফ কমাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নীতিসুদ হার অপরিবর্তিত রেখেই বছরের প্রথম ছয় মাসের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জানুয়ারি থেকে জুন সময়ের জন্য ঘোষিত এই মুদ্রানীতিতে নীতিসুদ হার আগের মতোই ১০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না নামা পর্যন্ত নীতিগতভাবে সুদহার কমানোর সুযোগ দেখছে না তারা।

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা ছাড়া বাকি সূচকগুলোতে মুদ্রানীতি সফল হয়েছে। আমরা খুব ভালো করেছি, শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এখনো পুরোপুরি সফল হতে পারিনি।”

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে। আগের মাস ডিসেম্বরে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। টানা কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার কারণে নীতিসুদ হার কমালে অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অবস্থান বজায় রেখেছে। তবে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য বিনিয়োগে আনতে স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি বা এসডিএফ হার ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। বিপরীতে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি বা এসএলএফ হার আগের মতোই সাড়ে ১১ শতাংশে রাখা হয়েছে।

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “আমরা চাই ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকা রেখে বসে না থাকে। বিনিয়োগ ও উৎপাদন খাতে ঋণ দিক। সে কারণেই এসডিএফ হার কমানো হয়েছে, ভবিষ্যতে আরও কমানো হতে পারে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, অনেক ব্যাংক বেসরকারি খাতে ঋণ না বাড়িয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা জমা রেখে ঝুঁকিমুক্ত মুনাফা অর্জনে আগ্রহী। এতে ঋণপ্রবাহ স্থবির হয়ে পড়ছে। এসডিএফ হার কমিয়ে এই প্রবণতা নিরুৎসাহিত করাই নতুন মুদ্রানীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। আগের মেয়াদে এই লক্ষ্য ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। যদিও গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।

মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, “রিজার্ভ এখন ভালো অবস্থানে আছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী রিজার্ভ ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে, যা আগে কখনো হয়নি। রিজার্ভ বাড়ছে, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহও বাড়ছে।” তার মতে, নীতিসুদ হার বেশি রাখার ফলেই বিনিময় হার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আগেই পরামর্শ দিয়েছে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত নীতিসুদ হার না কমাতে। সেই পরামর্শের ধারাবাহিকতায় নতুন মুদ্রানীতিতেও সতর্ক অবস্থান বজায় রাখা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকলেও সরবরাহপক্ষের সীমাবদ্ধতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি এখনো লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় সংসদ নির্বাচন, রমজান মাস এবং সম্ভাব্য নতুন বেতন কাঠামোর প্রভাব স্বল্পমেয়াদে চাহিদা বাড়াতে পারে বলেও সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ছয় মাস অন্তর ঘোষিত এই মুদ্রানীতির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে চাচ্ছে, অন্যদিকে সুদের হার করিডরে সীমিত সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক গতি ফেরানোর কৌশল নিয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে