সুন্দরবন, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, আবারও দস্যুদের তৎপরতায় অস্থির হয়ে উঠেছে। বনজীবী, জেলে, মৌয়াল, কাঠুরে থেকে শুরু করে পর্যটক—সবাইকে আতঙ্কে রেখেছে দস্যুদের পুনরুত্থান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, গত দুই বছরে ধারাবাহিক অভিযানে দস্যুদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্য এসেছে। তবে দস্যুদের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে সুন্দরবনে দস্যুদের উৎপাত নতুন করে শুরু হয়। এরপর থেকে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। মোংলা কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের একজন কর্মকর্তা বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে সুন্দরবনে দস্যুদের উৎপাত শুরু হয়। এরপর থেকে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বনদস্যু দমনের পাশাপাশি সুন্দরবনে সব ধরনের অপরাধ নির্মূলে সচেষ্ট রয়েছে কোস্ট গার্ড। গত দুই বছরে কোস্ট গার্ডের অভিযানে মোট ৫৭ জন দস্যু ও তাদের সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০২৪ সালে আটজন দস্যু গ্রেপ্তার হয়। উদ্ধার করা হয় পাঁচটি আগ্নেয়াস্ত্র, তিনটি হাতবোমা, চারটি দেশি অস্ত্র, আটটি কার্তুজ, ১০০ ইয়াবা বড়ি, সাতটি মুঠোফোন ও ৪৭৯টি স্প্ল্লিন্টার বল। একই সময়ে দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা ৪৮ জন জেলেকে মুক্ত করা হয়। পরের বছর দস্যুদের তৎপরতা আরও বেড়ে যায়। ২০২৫ সালে কোস্ট গার্ডের অভিযানে ৪৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা হয় ৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, দুটি হাতবোমা, ৭৪টি দেশি অস্ত্র, বিপুল অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম ও ৪৪৮টি কার্তুজ। একই সঙ্গে জিম্মি থাকা ৫২ জন নারী-পুরুষকে মুক্ত করা হয়। সামপ্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি। সুন্দরবনের গোলকানন রিসোর্ট থেকে কানুরখালসংলগ্ন এলাকায় কাঠের নৌকায় ভ্রমণের সময় ডাকাত মাসুম বাহিনীর সদস্যরা দুজন পর্যটক ও রিসোর্টমালিককে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে। এ ঘটনায় সুন্দরবনের পর্যটন খাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানালে কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে তাৎক্ষণিকভাবে যৌথ অভিযান শুরু হয়। টানা ৪৮ ঘণ্টার অভিযানে অপহৃত তিনজনকে উদ্ধার করা হয় এবং ডাকাত দলের একাধিক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাগেরহাটের সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করীম চৌধুরী বলেন, বনজীবীদের নিরাপত্তায় বনরক্ষীদের টহল জোরদার করা হয়েছে। দস্যুদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। কোস্ট গার্ড জানায়, গত এক বছরে পরিচালিত অভিযানে আছাবুর বাহিনী, হান্নান বাহিনী, আনারুল বাহিনী, মঞ্জু বাহিনী, রাঙ্গা বাহিনী, করিম-শরিফ, আল-আমিন, ছোট সুমন ও ছোটন বাহিনীসহ বিভিন্ন ডাকাত দলের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় জেলে ও বনজীবীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, অস্ত্র ব্যবসা ও মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। সুন্দরবনের জেলে ও মৌয়ালরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনে প্রবেশ করেন। দস্যুদের হাতে জিম্মি হওয়ার ভয় তাদের পিছু ছাড়ে না। অনেক সময় মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করতে পরিবারকে ঋণ নিতে হয়। আবার মুক্তিপণ না দিলে প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে। কোস্ট গার্ডের অভিযানে অনেক জেলে মুক্ত হলেও দস্যুদের পুনরুত্থান তাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। সুন্দরবন বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এখানে আসেন রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমিরসহ নানা বন্যপ্রাণী দেখতে। কিন্তু দস্যুদের অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনায় পর্যটকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। অপহরণ ঘটনা প্রমাণ করেছে, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সুন্দরবনের পর্যটন শিল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। কোস্ট গার্ড বলছে, তারা বন বিভাগ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিতভাবে অভিযান চালাচ্ছে। তবে সুন্দরবনের ভেতরে দস্যুদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন। ঘন বন, নদী-খাল ও বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল দস্যুদের লুকিয়ে থাকার সুযোগ করে দেয়। ফলে অভিযান পরিচালনা করতে সময় ও জনবল উভয়েরই বড় চ্যালেঞ্জ থাকে। সুন্দরবনের দস্যুতা শুধু বনজীবীদের জীবিকা নয়, দেশের পর্যটন ও অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি। কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক অভিযান দস্যু দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, কিন্তু দস্যুদের পুনরুত্থান প্রমাণ করছে যে সমস্যা এখনও পুরোপুরি সমাধান হয়নি। বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা সম্ভব নয়। সুন্দরবনের দস্যুদের পুনরুত্থানকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনগণের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। জেলেরা বলছেন, তারা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে যান। মৌয়ালরা মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে দস্যুদের হাতে জিম্মি হওয়ার ভয় পান। কাঠুরেরা গাছ কাটতে গিয়ে দস্যুদের কাছে মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হন। এসব অভিজ্ঞতা তাদের জীবনে স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করেছে। অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে। পর্যটন খাতেও এর প্রভাব পড়ছে। সুন্দরবনে পর্যটকদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যটক কমে যাওয়ায় তাদের আয় কমে গেছে। হোটেল, রিসোর্ট, নৌকা ভাড়া ব্যবসা—সবকিছুতে মন্দা দেখা দিয়েছে। পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হাজারো মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, সুন্দরবনের ভেতরে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন। ঘন বন, নদী-খাল, বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল দস্যুদের লুকিয়ে থাকার সুযোগ করে দেয়। ফলে তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে সময় লাগে। অভিযানে বিপুল জনবল ও সরঞ্জাম প্রয়োজন হয়। তবু তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দস্যু দমন শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়। স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। বনজীবীদের বিকল্প জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দস্যুদের অবস্থান শনাক্ত করতে হবে। সুন্দরবনের দস্যুতা শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়, জাতীয় সমস্যা। এটি দেশের অর্থনীতি, পর্যটন, পরিবেশ—সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলছে। কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক অভিযান দস্যু দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, কিন্তু দস্যুদের পুনরুত্থান প্রমাণ করছে যে সমস্যা এখনও পুরোপুরি সমাধান হয়নি। বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা সম্ভব নয়।