নির্বাচনকে সামনে রেখে বাড়ছে মাদকের বিস্তার

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম
নির্বাচনকে সামনে রেখে বাড়ছে মাদকের বিস্তার

বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনি দায়িত্বে ব্যস্ত থাকায় এই সুযোগে মাদক কারবারিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। সীমান্তবর্তী এলাকায় ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা ও হেরোইনের চালান বেড়ে গেছে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে মাদকের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের সময় অস্ত্র ও মাদকের চোরাচালান বেড়ে যায়, কারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেশিশক্তি প্রদর্শন ও কালো টাকার ছড়াছড়ি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় তরুণদের মাদকসেবন, যা সমাজে আরও অস্থিরতা তৈরি করে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ইতোমধ্যে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ৩২ জেলায় ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কর্মস্থল ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সীমান্তের ৩৮৬টি পয়েন্ট দিয়ে মাদক প্রবেশের আশঙ্কা থাকায় বিশেষ টহল ও চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন, শাহপরীর দ্বীপসহ মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার বড় চালান আসছে। অন্যদিকে সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল ও গাঁজা প্রবেশ করছে। ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরাম সীমান্ত ব্যবহার করে সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনী দিয়েও মাদকের চালান আসছে। ডিএনসির পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে প্রায় ৯১ হাজার অভিযান চালিয়ে ২৫ লাখের বেশি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে অভিযান বেড়ে এক লাখের বেশি হয় এবং উদ্ধার হয় প্রায় ৪৮ লাখ ইয়াবা। একই সময়ে হাজার হাজার কেজি গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিলও জব্দ করা হয়েছে। মামলা হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার। অর্থাৎ নির্বাচনের সময় মাদকবিরোধী অভিযান বাড়লেও মাদকের প্রবাহও বেড়ে গেছে। ডিএনসির টেকনাফ বিশেষ জোনের সহকারী পরিচালক কাজী দিদারুল আলম জানিয়েছেন, সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইয়াবার চালান ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান ও টহল জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সদস্য ডা. অরূপ রতন চৌধুরী মনে করেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনি কাজে ব্যস্ত থাকে। এই সুযোগে মাদক কারবারিরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উচিত এই সময়টাতে আরও বেশি নজরদারি দেওয়া। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলের প্রধান এজেন্ডা হওয়া উচিত মাদকের বিরুদ্ধে প্রচারণা। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল এখনো এটা বলছে না। দেশে তরুণ-যুব সমাজের বড় অংশ মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের মাদক থেকে সরিয়ে আনতে রাজনৈতিক দলের অগ্রণী ভূমিকা থাকা দরকার। অন্যদিকে, মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা নিয়ে নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। দেশে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ। এদের মধ্যে বড় অংশ তরুণ। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো গাঁজা। গবেষণায় দেখা গেছে, মাদক ব্যবহারকারীদের ৬০ শতাংশই ১৮ বছরের কম বয়সে মাদকসেবন শুরু করে। তবে চিকিৎসা সেবার আওতায় আসছে খুবই নগন্য সংখ্যক মানুষ। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বলা হয়েছে, শহরাঞ্চলে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী রয়েছে ঢাকা বিভাগে, আর সর্বনিম্ন বরিশাল বিভাগে। সীমান্তবর্তী জেলা ও বড় শহরের আশপাশের এলাকাগুলোতে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো গাঁজা। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল এবং কোডিনজাত কাশি সিরাপ। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতিরোধের পাশাপাশি চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক পুনঃঅন্তর্ভুক্তির ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে কিশোর ও তরুণদের লক্ষ্য করে সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করার আহ্বান জানান তাঁরা। নির্বাচনি প্রচারণায় অনেক প্রার্থী এখনও বিড়ি-সিগারেট বিলি করেন, যা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের পরিপন্থি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি মাদক ও তামাকবিরোধী প্রচারণাকে নির্বাচনি এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করে, তবে তরুণ সমাজকে সচেতন করা সম্ভব হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন সামনে রেখে মাদকের বিস্তার শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমান্তে নজরদারি, নিয়মিত অভিযান এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তরুণদের পুনর্বাসন ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি, যাতে তারা মাদকের ফাঁদে না পড়ে।