নদী খনন, ড্রেজিং, সংস্কার, শাসন, সংরক্ষণ না করায় তিস্তা নদীর উপর ৯২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে মাওলানা ভাসানী সেতুটি নির্মাণ হলেও তলদেশে পানি না থাকায় শুধুই ধুঁ-ধুঁ বালুচরে পরিনত হয়েছে। পায়ে হেঁেট নদীপার হচ্ছেন মানুষজন। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও পলি জমে ভরে উঠেছে তিস্তা নদী। খরস্রোতা অগভীর ভরা তিস্তা এখন মরা খালে পরিনত হয়েছে। দেখা দিয়েছে নাব্যতা সংকট। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর, বেলকা, হরিপুর, শান্তিরাম, কঞ্চিবাড়ি, চন্ডিপুর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের উপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদী দীর্ঘ ৫৪ বছরেও ড্রেজিং এবং খনন করা হয়নি। সে কারণে তিস্তা ভরাট হয়ে এখন আবাদী জমিতে রুপ নিয়েছে। তিস্তা তার গতিপথ পরিবর্তন করে অসংখ্য শাখা নদীতে বিভক্ত হয়েছে। বছরে মাত্র ৬ মাস মুল নদীতে নৌকা চলাচল করলেও গোটা বছর পায়ে হেঁেট পারাপার করতে হয় চরবাসিকে। এরই ধারাবাহিকতায় মাওলানা ভাসানী সেতুর তলদেশে হচ্ছে বিভিন্ন ধরণের চাষাবাদ। নদী পাড়ের মানুষ বলেন, এক সময় উপজেলার পাঁচপীর, বেলকা, মীরগঞ্জ ও তারাপুর খেয়োঘাট হতে পীরগাছা, কাউনিয়া, উলিপুর, কুড়িগ্রাম, কাশিমবাজার, চিলমারি, রৌমারি, মোল্লার চর, ভূরুঙ্গামারি, দেওয়ানগঞ্জ, কামারজানি, গাইবান্ধা, সাঘাটা, ফুলছড়ি, জামালপুর, নারায়নগঞ্জ, বালাশিঘাট, ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ রুটে নৌ-চলাচল করত। বর্তমানে নাব্যতা সংকটে সবরুটে নৌ-চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। তিস্তায় হাজারও নৌ-শ্রমিক ও জেলে নৌকা চালিয়ে এবং মাছ ধরে সংসার চালাত। তারা এখন বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। অনেকে বাপ দাদার পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশা জড়িয়ে পড়েছে। অন্য জেলায় গিয়ে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন। বেলকা চরের জেলে সুকুমার দাস বলেন, সেতু দিয়ে কি লাভ। যে নদীতে পানি নাই সেখানে সেতু মানায় না। তিস্তা নদীতে এখন পলি জমে নদী ভরে গেছে। নদীতে আর মাছ ধরার কোন সুযোগ নেই। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আমরা জেলেরা তিস্তা নদীতে আর মাছ ধরতে পারি না। সে কারনে অনেকে বাজারে মাছের ব্যবসা করছে। আবার অনেকে রিস্কা, ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাচ্ছে। নদী খনন করলে নৌকা চলবে, এবং সেতুর শোভা বর্ধন হবে। হরিপুর চরের নৌ-শ্রমিক আলম বলেন, আজ থেকে ১০ বছর আগে তার পাঁচটি নৌকা ছিল। নৌকার ব্যবসা দিয়ে সে সংসার চালাত। এখন মাত্র একটি নৌকা তার। সেটিও বছরের ৪ মাস মুল নদীতে চলাচল করে। নদী ভরে উঠায় এখন আর নৌকা চলে না। সে কারনে মাঝি মাল্লারা বেকার হয়ে পড়েছে। নদী খনন বা ড্রেজিং করলে হয়তো তিস্তা তার গতিপথ ফিরে পাবে। নদীতে পানি না থাকায় বালু চরে পড়ে থাকায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে নৌকা। সেতু থেকে লাভ কি হল? সেই চরবাসিদের তো হেঁটেই নদী পার হতে হচ্ছে। সেতুর ওপর দিয়ে কি যানবাহন চলার জন্য এটি নির্মাণ করা হয়ে? না এর তলদেশ দিয়ে নৌকা চলবে। কাপাসিয়ার বাদামের চরের ব্যবসায়ী ইউনুছ আলী বলেন, জেলা ও উপজেলা শহর হতে কাপাসিয়া ইউনিয়নের বাদামের চরের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। নৌ-চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন বিভিন্ন যানবাহনে জেলা ও উপজেলা শহর হতে মালামাল নিয়ে এসে ব্যবসা করা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ঘোড়ার গাড়ি ও পায়ে হাঁটা ছাড়া অন্য কোন উপায়ে চরের মধ্যে চলাচলের কোন মাধ্যম নেই। সেতু দিয়ে তো শুধু উপজেলা শহরে যাতায়াত করা যায়। তার দাবি নদীর মাঝ চরে বসবাসরত লোকজনরা কিভাবে যাতায়াত করবেন। এ জন্য নদী খনন একান্ত প্রয়োজন। হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মোজহারুল ইসলাম বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে, মওলানা ভাসানী সেতু তার রুপ ফিরে পাবে। তা না হলে, ৯২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতু কোন কাজেই আসবে না। খনন না করায় তিস্তা নদী এখন আবাদি জমিতে পরিনত হয়েছে। উজানের পলি জমে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে অসংখ্য শাখা নদীতে রুপ নিয়েছে। উপজেলা শহর হতে প্রায় ২০ রুটে নৌ-চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সে কারনে সেতুর তলদেশ দিয়ে চরবাসি পায়েঁ হেটে চলাচল করছে। বেকার হয়ে পড়েছে হাজারও জেলে ও নৌ-শ্রমিকরা। নদী খনন ও ড্রেজিং এখন সময়ের দাবি। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবার্হী প্রকৌশলী মো. হাফিজুল হক বলেন, নদী খনন, ড্রেজিং ও সংরক্ষণ এবং স্থায়ী ভাবে ভাঙন রোধ সরকারের উপর মহলের সিদ্ধানের ব্যাপার। এখানে তাদের কোন হাত নেই।