বাংলাদেশ থেকে উদ্বেগজনক হারে কমছে নারী অভিবাসন

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৮:১৫ এএম
বাংলাদেশ থেকে উদ্বেগজনক হারে কমছে নারী অভিবাসন

বাংলাদেশ থেকে নারী অভিবাসন উদ্বেগজনক হারে কমছে। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট রামরু-র সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে নারী অভিবাসন প্রায় ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। যদিও সামগ্রিকভাবে শ্রম অভিবাসন বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ, নারী অংশগ্রহণ ক্রমাগত নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন পুরুষ ও নারী বিদেশে গেছেন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। কিন্তু নারী অভিবাসনের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬২ হাজার ৩১৭ জন, যা মোট অভিবাসীর মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর এক লাখেরও বেশি নারী বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন। ২০২২ সালে সংখ্যাটি ছিল ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ জন। কিন্তু ২০২৩ সাল থেকে নারী অভিবাসন ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করেছে। রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার ড. তাসনিম সিদ্দিকীর মতে, নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রে শোভন কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা, গৃহের অভ্যন্তরে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং গত এক দশকে নেতিবাচক রিপোর্টের আধিক্য নারীদের নিরুৎসাহিত করছে। তিনি আরও বলেন, গার্মেন্টস শিল্পে একসময় নারীর অংশগ্রহণ ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ, যা এখন কমে ৫৫ শতাংশে নেমে এসেছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রভাবের পাশাপাশি রক্ষণশীল পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা নারীর গৃহের বাইরে কর্মে অংশগ্রহণকে সীমিত করছে কিনা, তা গবেষণা করে দেখা প্রয়োজন। অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, নারী অভিবাসন কমার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত নারীরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অনেকেই দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, বেতন পাচ্ছেন না বা পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। দক্ষতার ঘাটতিও বড় সমস্যা। নারীদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ সীমিত হওয়ায় তারা মূলত কম মজুরির গৃহকর্মী হিসেবে বিদেশে যাচ্ছেন। সামাজিক কলঙ্কও একটি বড় বাধা। নারী অভিবাসনকে এখনও অনেক পরিবার নেতিবাচকভাবে দেখে, যা নতুন প্রজন্মকে নিরুৎসাহিত করছে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি কর্মীরা ২০২৫ সালে ১৪১টি দেশে গেছেন। তবে কার্যত ৯০ শতাংশ কর্মী মাত্র পাঁচটি দেশে অভিবাসিত হয়েছেন। কাতার, ব্রুনাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দক্ষিণ কোরিয়া, কুয়েত, হংকং এবং জাপানে নারী অভিবাসন ঘটেছে, তবে হংকং ও জাপানে সংখ্যা ছিল খুবই কম। দক্ষতার ভিত্তিতে বিশ্লেষণে দেখা যায়, পেশাজীবী কর্মীর সংখ্যা সবসময়ই সামান্য। প্রায় ৭০ থেকে ৭৪ শতাংশ নারী অভিবাসী আধা বা স্বল্পদক্ষ কর্মী হিসেবে বিদেশে গেছেন। সামপ্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নারী অভিবাসন কমার প্রবণতা স্পষ্ট। বাংলাদেশে এই প্রবণতা আরও তীব্র। আইএলওর মতে, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া নারী অভিবাসন টেকসই করা সম্ভব নয়। একইসঙ্গে তারা সতর্ক করেছে, নারী অভিবাসন কমে গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। নারী অভিবাসন কমে যাওয়ার ফলে শুধু রেমিট্যান্স প্রবাহ নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নারী অভিবাসন অনেক পরিবারকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করেছে। নারীরা বিদেশে গিয়ে আয় করে দেশে পরিবারকে সহায়তা করেছেন, সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছেন, বাড়ি তৈরি করেছেন। কিন্তু নারী অভিবাসন কমে যাওয়ায় এসব পরিবার আবারও আর্থিক সংকটে পড়ছে। গার্মেন্টস শিল্পেও নারীর অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় শ্রমবাজারে বৈষম্য বাড়ছে। একসময় গার্মেন্টস শিল্পে ৯০ শতাংশ নারী কর্মী ছিলেন, এখন তা কমে ৫৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নারী অভিবাসনের পতন ও গার্মেন্টস শিল্পে নারীর অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার মধ্যে একটি সম্পর্ক রয়েছে। রামরু নারী অভিবাসন টেকসই করতে একাধিক নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিএমইটিকে একাধিক পরিদফতর বিশিষ্ট অধিদফতরে রূপান্তর, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য পৃথক ক্যাডার সার্ভিস চালু, নারী অভিবাসীদের জন্য বিদেশে আশ্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নার্সিং কোর্স বাধ্যতামূলক করা এবং দক্ষতা পরীক্ষার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও ট্র্যাকযোগ্য করা। এছাড়া অভিবাসন খাতে জাতীয় বাজেটের ১ শতাংশ অথবা বার্ষিক রেমিট্যান্সের ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, নারী অভিবাসন টেকসই করতে হলে দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং উন্মুক্ত অভিযোগ ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে। তারা সতর্ক করেছেন, যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তবে বাংলাদেশ নারী অভিবাসনে স্থায়ীভাবে পিছিয়ে পড়বে। বাংলাদেশ থেকে নারী অভিবাসন একসময় মোট শ্রম প্রবাহের ১৬ শতাংশ ছিল, এখন তা কমে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নারী অভিবাসনের এই নিম্নমুখী প্রবণতা শুধু রেমিট্যান্স প্রবাহ নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নারী অভিবাসনকে নিরাপদ ও টেকসই করতে হলে সরকার, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে বাংলাদেশের নারী অভিবাসন সংকট আরও গভীর হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে