বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানচিত্রের দিকে তাকালে একটি সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে-সুন্দরবন কেবল বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন নয়, এটি আমাদের কোটি মানুষের অস্তিত্বের অতন্দ্র প্রহরী। সিডর, আইলা, আম্পান কিংবা সিত্রাং-এর মতো প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়গুলো যখন উপকূলে আছড়ে পড়েছে, তখন সুন্দরবনই নিজের বুক পেতে ঢাল হয়ে রক্ষা করেছে আমাদের। ১৫ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার রাজপথে তরুণ পরিবেশকর্মীদের ‘নীরব বন, নীরব আমরা নয়’ স্লোগানটি তাই কেবল একটি দাবি নয়, বরং বেঁচে থাকার এক তীব্র আর্তনাদ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এখন আর তাত্ত্বিক কোনো আশঙ্কা নয়, বরং উপকূলবাসীর জন্য রূঢ় বাস্তবতা। এই প্রেক্ষাপটে আমরা যখন কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণের কথা ভাবি, তখন অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃতির চিরস্থায়ী সমাধানের কথা ভুলে যাই। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ গাছগুলোর জটিল শ্বাসমূল ও ঘন শিকড় জলোচ্ছ্বাসের গতি কমিয়ে দেয় এবং পলিমাটি আটকে রেখে নতুন ভূমি সৃষ্টিতে সাহায্য করে। এটি একটি জীবন্ত ‘বাফার জোন’। গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে বনায়ন ঘন, সেখানে ঢেউ সরাসরি জনপদে আঘাত করতে পারে না। ফলে কংক্রিটের কৃত্রিম বাঁধের চেয়ে এই সবুজ বেষ্টনী অনেক বেশি টেকসই ও সাশ্রয়ী। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের জীবিকার এক বিশাল দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। টেকসই ইকো-ট্যুরিজম বা পরিবেশবান্ধব পর্যটন নীতিমালার মাধ্যমে গাইড, নৌকার মাঝি ও হস্তশিল্পীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন বন রক্ষা পাবে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। বন রক্ষা মানে কেবল গাছ বাঁচানো নয়; এটি বঙ্গোপসাগরের মাছের অন্যতম বড় ‘নার্সারি’ রক্ষা করা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার ধীর করে দেওয়া। দীর্ঘদিন ধরে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে সুন্দরবন দিবস হিসেবে পালন করা হলেও এখন পর্যন্ত এটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। সাতক্ষীরার তরুণ সমাজ ও পরিবেশকর্মীরা যে দাবি তুলেছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। সুন্দরবন দিবসকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করলে বন রক্ষার বিষয়টি জাতীয় অগ্রাধিকার তালিকায় চলে আসবে। এর ফলে অবৈধ বননিধন, চোরাশিকার এবং অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষের মতো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা সহজ হবে। সুন্দরবন রক্ষায় আমাদের ‘কমিউনিটি-ভিত্তিক বন ব্যবস্থাপনা’ জোরদার করতে হবে। জেগে ওঠা নতুন চরে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে লবণ-সহনশীল দেশীয় প্রজাতির বনায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে সুন্দরবন থেকে জলদস্যু কার্যক্রম ও বিষ দিয়ে মাছ ধরা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সুন্দরবন ধ্বংস হলে কেবল রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল হারাবে না, বিপন্ন হবে কোটি মানুষের জীবন। সুন্দরবন রক্ষা করা মানে আমাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। তরুণ প্রজন্মের এই পদযাত্রা ও মানববন্ধন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বনের নীরবতাকে আমাদের নীরবতা দিয়ে প্রশ্রয় দেওয়ার সময় আর নেই। রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের উচিত দ্রুত সুন্দরবন দিবসকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া, সুন্দরবন রক্ষায় পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করা এবং সুন্দরবন রক্ষায় কঠোর আইন ও পরিকল্পিত বনায়ন নিশ্চিত করা। সুন্দরবন বাঁচলে তবেই বাঁচবে আমাদের উপকূল, বাঁচবে বাংলাদেশ।