চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর নিয়ে গঠিত কুড়িগ্রাম-৪ আসনে এবার বিএনপির প্রত্যাশা ছিল অনেক বড়। প্রচারণায় সরব উপস্থিতি, কেন্দ্রভিত্তিক এজেন্ট নিয়োগ, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গণসংযোগ-সব মিলিয়ে দলীয় শিবিরে আত্মবিশ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
স্থানীয়ভাবে অনেকে ধরে নিয়েছিলেন, জাতীয়পার্টির দীর্ঘদিনের দুর্গ এবার বিএনপি’র দখলে যাচ্ছে। কিন্তু ফল ঘোষণার পর পাল্টে যায় হিসাব-নিকাশ। শেষ পর্যন্ত জয় পায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী।
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সাত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল লড়াই হয় বিএনপির মো. আজিজুর রহমান ও জামায়াত-মনোনিত মো. মোস্তাফিজুর রহমানের মধ্যে। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে মোস্তাফিজুর রহমান ভোট পেয়েছিলেন ১,০৬,৩৪৭ ভোট। ধানের শীষ প্রতীকে আজিজুর রহমান পেয়েছিলেন ৮৩,৭৮২ ভোট। ব্যবধান ২২,৫৬৫-যা স্থানীয় রাজনীতিতে বড় ধাক্কা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ভোট কেন্দ্রের প্রদত্ত ভোটের অঙ্ক বলছে, চিলমারীতে বিএনপি তুলনামূলক ভালো করলেও রৌমারী ও রাজিবপুরে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সীমান্তবর্তী ও দুর্গম চরাঞ্চলে সাংগঠনিক উপস্থিতি দুর্বল ছিল। প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ আগে থেকেই পরিবহন ও ভোটার ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুত থাকলেও বিএনপির প্রস্তুতি ছিল বিচ্ছিন্ন।
কুড়িগ্রাম-৪ আসনের ৩ উপজেলার ভোট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রৌমারী উপজেলায় ১৭৭০৯৯ জন ভোটারের মধ্যে ৬১ কেন্দ্রে মোট ১১৩৯৭৭ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এর মধ্যে ১৯০৭ টি ভোট বাতিল হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী ৭ প্রার্থীর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছিলেন ৫৭০৪১ ভোট। বিএনপি’র মো. আজিজুর রহমান ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছিলেন ৪৭০৬৫ ভোট। ভোট ব্যবধান ৯৯৭৬ টি।
রাজিবপুর উপজেলায় ৬৮৭০২ ভোটারের মধ্যে ২৭ কেন্দ্রে মোট ৪৫০৩৩ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এর মধ্যে ৬১০ টি ভোট বাতিল হয়। এ উপজেলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছিলেন ২৪৬৫৫ ভোট। বিএনপি’র মো. আজিজুর রহমান ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছিলেন ১৮৫৫৯ ভোট। ভোট ব্যবধান ৬০৯৬ টি।
এবং চিলমারী উপজেলায় ১১৩১৬৬ জন ভোটারের মধ্যে ৪২ কেন্দ্রে মোট ৬৪২৮৫ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এর মধ্যে ১১০১ টি ভোট বাতিল হয়। এ উপজেলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছিলেন ২৪৬৫১ ভোট। বিএনপি’র মো. আজিজুর রহমান ধানের শীষ প্রতিকে পেয়েছিলেন ১৮১৩৮ ভোট। ভোট ব্যবধান ৬৫১৩ ট্লি।
বিএনপি’র তৃণমূলের একাধিক নেতাকর্মীর ভাষ্য, প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই দলে সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট হয়। তিন উপজেলার একাংশ নেতা সক্রিয় থাকলেও অন্য অংশ নীরব দূরত্বে ছিলেন। ইউনিয়ন পর্যায়ে বিএনপি’র অঙ্গ-সংগঠনের একাধিক কমিটি থাকলেও কার্যকর মাঠ-সমন্বয় দেখা যায়নি।
রৌমারী উপজেলা বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক রাজু আহম্মেদ বলেন,‘প্রচারণা ছিল, কিন্তু ঐক্য ছিল না। ভেতরের দ্বন্দ্বই শেষ পর্যন্ত ক্ষতি করেছে।’
দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মীদের উপেক্ষা এবং নতুন গোষ্ঠীর প্রাধান্য নিয়েও অসন্তোষ ছিল। চিলমারী উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সাঈদ হোসেন পাখী সমকাল’কে বলেন,‘যোগ্য ও পরীক্ষিত কর্মীদের মূল্যায়ন না করা এবং কমিটি গঠন নিয়ে বিতর্কই ভরাডুবির কারণ।’
এবারের নির্বাচনে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ভোটের দিন সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। স্থানীয় সিনিয়র সাংবাদিক নাজমুল হুদা পারভেজ’র মতে, ‘নারী ভোটের বড় অংশ জয়-পরাজয়ের ক্ষেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’
সালমা বেগম নামে এক নারী ভোটার বলেন,‘আমরা কথার চেয়ে কাজ দেখি। বিপদে-আপদে কে পাশে দাঁড়িয়েছে, কে খোঁজ নিয়েছে, সেটাই মনে রেখেছি। ভোট দেওয়ার সময় সেই মানুষটার কথাই ভেবেছি।’
রাজিবপুর উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শামিম আহম্মেদ বলেন,‘প্রার্থীর ছেলে মোহাম্মদ আলীকে নির্বাচনী উপদেষ্টা করা হলেও তিনি মাঠপর্যায়ে নেতা-কর্মীদের কার্যকরভাবে সংগঠিত করতে পারেননি। পাশাপাশি নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে আলাদা কৌশল না নেওয়াও পরাজয়ের একটি বড় কারণ।’
এদিকে কুড়িগ্রাম-৪ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও এবার লাঙল প্রতীকে কে এম ফজলুল মন্ডল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পেয়েছেন মাত্র ২ হাজার ১৪৯ ভোট, যা মোট প্রদত্ত ভোটের শূন্য দশমিক ৯৭ শতাংশ।
এ ফল নিয়ে চিলমারী প্রেসক্লাব সভাপতি ও স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক নজরুল ইসলাম সাবু সমকাল’কে বলেন, ‘একসময় এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রভাব ছিল দৃশ্যমান ও সুসংগঠিত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সংগঠনের ভিত নড়বড়ে হয়েছে। তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ কমেছে, তরুণ ভোটারদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থতা দেখা গেছে। শুধু অতীতের জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করলে এখন আর চলবে না। নিয়মিত মাঠে থাকা, স্থানীয় সমস্যা নিয়ে কাজ করা এবং গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব তুলে ধরতে না পারলে ভোটাররা বিকল্প খুঁজে নেয়। এবারের ফলাফল দলটির জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত।’
চিলমারী উপজেলা বিএনপি’র আহবায়ক কমিটির সদস্য সচিব আবু হানিফা সমকাল’কে বলেন,‘ভোটের ফল আমাদের জন্য স্পষ্ট বার্তা। আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতা মেনে সংগঠনকে নতুনভাবে গুছিয়ে নিতে হবে। তৃণমূলকে আরও সক্রিয় ও শক্তিশালী করার পাশাপাশি নারী ও তরুণ ভোটারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়াতে হবে। এ অঞ্চলে নারীদের ধর্মীয় অনুভূতিকে কৌশলে কাজে লাগিয়েছে জামায়াতে ইসলামি। সে জায়গায় আমরা পিছিয়ে ছিলাম। আগামী দিনে এই ঘাটতি পরিকল্পিতভাবে পূরণে কাজ করা হবে।’